লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে বাসায় ঢুকে মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করেছে এক যুবক। বৃহস্পতিবার সকালে রায়পুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গোডাউন রোডের ধানহাটা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
পালিয়ে যাওয়ার সময় ওই যুবককে আটক করে গণপিটুনি দেয় এলাকাবাসী। পরে দুপুরে হাসাপাতালে সেও মারা যায়। অভিযুক্ত যুবকের নাম অন্তর মজুমদার। তার বাড়ি নোয়াখালীর সুবর্ণচর এলাকায়।
নিহতরা হলেন-মা শাহিনুর বেগম (৩৮), বড় মেয়ে সায়মা আক্তার (২১), মেজ মেয়ে ইকরা আক্তার (১৭) ও ছোট মেয়ে শিফা আক্তার (৯)। সায়মা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ও ইকরা রায়পুর কাজী ফারুকী কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাড়িতে না থাকায় শাহিনুরের একমাত্র ছেলে কলেজছাত্র জুনায়েদ ইসলাম শিফাত ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পাঁচ থেকে ছয় বছর আগে শাহিনুর বেগম যে ভবনে বাসা নিয়ে থাকেন, একই ভবনে আরেক বাসায় থাকত অন্তর মজুমদার। সে ফল ব্যবসায়ী। সে একই এলাকায় আরেকটি বাসায় থেকে রায়পুর শহরে ফল বিক্রি করে আসছিল। কোনো একটি বিষয় নিয়ে বিরোধ থাকায় এক সময় অন্তরকে বাড়িওয়ালা বের করে দিতে বাধ্য হন। তাছাড়া শাহিনুর বেগমের কাছে টাকা পাওনা ছিল তার।
গতকাল সেই টাকা নিতে সে শাহিনুর বেগমের বাসায় আসে। টাকা লেনদেন নিয়ে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে অন্তর হাতের কাছে থাকা দা দিয়ে শাহিনুরকে কোপাতে শুরু করে। তার চিৎকারে তিন মেয়ে মাকে বাঁচাতে ছুটে আসে। অন্তর তাদেরও কোপায়।
পরে গুরুতর অবস্থায় তাদের রায়পুর সরকারি হাসপাতালে নিলে সেখানে শাহিনুর, সায়মা ও শিফা মারা যায়। আর ঢাকায় নেওয়ার পথে ইকরার মৃত্যু হয়। ভবনের পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় জনতার হাতে ধরা পড়ে অন্তর। গণপিটুনিতে গুরুতর আহত অন্তরকে সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে সেখানে তার মৃত্যু হয়।
বাড়ির মালিক ও প্রতিবেশীদের বরাত দিয়ে লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ সুপার মো. আবু তারেক জানান, ওই যুবক স্ত্রীসহ প্রায় দেড় বছর ঘটনাস্থলে বাসা ভাড়া থাকতেন। প্রায় ৭-৮ মাস আগে সে বাসা ছেড়ে চলে যায়। পূর্বপরিচিত হিসেবে সকালে সে এ বাসায় আসে।
রায়পুর থানার এসআই জামাল হোসেন জানান, শাহিনুর বেগমের বাড়ি কুমিল্লা জেলায়। তিনি কয়েক বছর ধরে লক্ষ্মীপুরে পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকেন। তার স্বামী কামাল হোসেন ২০১৯ সালে রাস্তায় পড়ে থাকা বৈদ্যুতিক তারে স্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। অভিযুক্ত অন্তরকে গণপিটুনির সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে পুলিশ। এ সময় উত্তেজিত জনতার ছোড়া ইট-পাটকেলে পুলিশের সাত সদস্য আহত হয়।
শিফাতের কেউ আর থাকল না, সব স্বপ্ন শেষ : ‘প্রায় ২৪ বছর আগে বাবা কামাল হোসেন আমাদের নিয়ে কুমিলা থেকে রায়পুর শহরে এসেছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, আমি কষ্ট করি। তোমরা মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করবে। একটা ভালো চাকরি করবে। আমাদের দুঃখ আর থাকবে না। বাবা আজ আর বেঁচে নেই। এখন আবার মা ও তিন বোনকে হারালাম। আমি কাকে নিয়ে বাঁচব। স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল।’
গতকাল বিকালে যুগান্তরের সঙ্গে আলাপের সময় কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো জানাচ্ছিলেন শাহিনুর বেগমের একমাত্র ছেলে শিফাত। ঘটনার সময় সে বাসায় ছিল না। সংসারে অভাব ঘোচাতে সে ভোরে একটি প্রতিষ্ঠানে কাজে চলে যায়।
শিফাত বলেন, ‘আমি কী নিয়ে বাঁচব, কী নিয়ে থাকব? আমার আর কেউ রইল না। আমাকে দেখবে কে? মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেল আমার সবকিছু। আমার চারপাশে এখন অন্ধকার।’
































