বিতর্ক ও আলোচনার শীর্ষে থাকা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নিরপেক্ষতা, তথ্যের উৎস এবং গবেষণা পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে বিভিন্ন মহল থেকে নানা প্রশ্ন উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার দাবি করলেও, সংস্থাটির প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন ও দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) ঘিরে সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজের একাংশ এবং প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, টিআইবি-র প্রতিবেদনে প্রায়শই মেথডোলজি ও তথ্যের নির্ভরযোগ্যতার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি লক্ষ করা যায়।
● ধারণানির্ভর সূচক ও তথ্যের নির্ভুলতা: টিআইবি-র দুর্নীতির ধারণা সূচক (CPI) সরাসরি কোনো মাঠপর্যায়ের বস্তুনিষ্ঠ তথ্য বা সরকারি ডেটার ওপর ভিত্তি করে তৈরি নয়। বরং এটি কিছু নির্দিষ্ট থিঙ্কট্যাঙ্ক এবং এনজিও-এর ধারণার (Perception) ওপর ভিত্তি করে প্রস্তুত করা হয়। সমালোচকদের মতে, মানুষের ধারণার ওপর ভিত্তি করে একটি দেশের দুর্নীতির সার্বিক চিত্র সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা যায় না, যা প্রায়ই বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।
● রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক: বিভিন্ন সময়ে তৎকালীন সরকারগুলোর পক্ষ থেকে টিআইবি-র বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে একপেশে মনোভাব প্রদর্শনের অভিযোগ তোলা হয়েছে। সরকারপক্ষের দাবি, নির্দিষ্ট কিছু আন্তর্জাতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন এবং ক্ষমতাসীন দলকে চাপে ফেলার উদ্দেশ্যে টিআইবি তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। অন্যদিকে, নিজস্ব গবেষণার জন্য কোনো নিরপেক্ষ বা জবাবদিহিতামূলক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি সংস্থাটি হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
● দাতা সংস্থার অর্থায়ন ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ: টিআইবি মূলত বিভিন্ন পশ্চিমা উন্নয়ন সহযোগী ও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত হয়। এর ফলে দাতা দেশ বা সংস্থাগুলোর ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ তাদের গবেষণা প্রতিবেদনে প্রভাব ফেলে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন মহলের মতে, এনজিও হিসেবে টিআইবি নিজেদের নিরপেক্ষ দাবি করলেও আর্থিক নির্ভরশীলতার কারণে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না।
● অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি: রাষ্ট্রীয় এবং প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা বললেও, বেসরকারি সংস্থা হিসেবে টিআইবি-র নিজস্ব কাজের পদ্ধতি কিংবা আর্থিক স্বচ্ছতা মূল্যায়নে কোনো স্বাধীন ব্যবস্থা নেই। সংস্থাটি কাদের কাছে জবাবদিহি করে—সেটি নিয়েও জনমনে প্রশ্ন থেকে গেছে।
● টিআইবি-র প্রতিক্রিয়া: এসব অভিযোগের জবাবে টিআইবি বরাবরের মতোই জানিয়েছে যে, দুর্নীতির ধারণা সূচক (সিপিআই) স্থানীয় কার্যালয় তৈরি করে না; এটি বার্লিনভিত্তিক কার্যালয় থেকে বৈশ্বিক ডেটা বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয়। পাশাপাশি দেশীয় গবেষণাগুলোও বৈজ্ঞানিক ও তথ্যভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করে করা হয় বলে সংস্থাটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।
তবে সমালোচকদের মতে, একটি উন্নয়নশীল দেশে দুর্নীতি প্রতিরোধে নাগরিক পর্যবেক্ষণ জরুরি হলেও, এ ধরনের বেসরকারি সংস্থার কাজের প্রক্রিয়া পুরোপুরি স্বচ্ছ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হওয়া আবশ্যক। বরিশাল টিআইবি এরিয়া কো-অর্ডিনেটর-সিভিক এনগেজমেন্ট আশফাকুর রহমান সময়ের বার্তাকে বলেন, টিআইবি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া, পদ্ধতি ও নীতির আলোকে কাজ করে। টিআইবি তার নীতি ও আদর্শ থেকে কখনো সরে না। নিজেদের সামর্থ্যের মধ্যে থেকেই ম্যান্ডেট অনুযায়ী দেশের সুশাসন, জবাবদিহিতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে।
তবে একটি সুশাসিত ও সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তোলা শুধু টিআইবি বা কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। একজন চেষ্টা করলেন, আর অন্যরা চেষ্টা করলেন না—এভাবে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। সুশাসন প্রতিষ্ঠা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসনকে শক্তিশালী করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ ও সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই আমরা একটি সুশাসিত, জবাবদিহিমূলক ও সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব।































