কেউ নগরের সড়কে ঝাড়ু দেন, কেউ ড্রেন পরিষ্কার করেন, কেউ ড্রেন থেকে ময়লা তোলেন, কেউ আবার নগরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগ্রহ করেন মানুষের ফেলে যাওয়া বর্জ্য। দুর্গন্ধ, পচা ময়লা, প্লাস্টিক, কাচ, ধারালো বস্তু কিংবা নানা ধরনের জীবাণু—কোনো কিছুই তাদের প্রতিদিনের কাজে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। অথচ এই মানুষগুলোর কাজ শেষ না হলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই থমকে যেতে পারে একটি নগরের স্বাভাবিক জীবন।
বরিশাল নগরকে পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য রাখতে প্রতিদিন এমনই কঠিন কাজ করে যাচ্ছেন বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের (বিসিসি) ৭০০-এর বেশি পরিচ্ছন্নতাকর্মী। নগরের সড়ক, ড্রেন, খাল, মাঠ, পুকুর ও বিভিন্ন স্থান পরিষ্কার করা, বর্জ্য অপসারণ এবং মশক নিধনসহ নানা দায়িত্ব তাদের কাঁধে। তাদের শ্রমে নগর পরিচ্ছন্ন থাকলেও পরিচ্ছন্নতা বিভাগ নিজেই রয়েছে নানা সংকটে।
জনবল ঘাটতি, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধতা, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম না থাকা, ক্লিনিক্যাল বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং নগরবাসীর অসচেতনতার কারণে সমস্যাগুলো দিন দিন জটিল হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কাউনিয়া হাউজিং এলাকার দীর্ঘদিনের ময়লার ভাগাড়, যেখানে বছরের পর বছর বর্জ্য জমে তৈরি হয়েছে বিশাল স্তূপ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু ময়লা পরিষ্কার করলেই নগর পরিচ্ছন্ন রাখা যাবে না। প্রয়োজন আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। আর সেই ব্যবস্থাপনায় বর্জ্যকে বোঝা হিসেবে না দেখে সম্পদে পরিণত করার সুযোগও রয়েছে।
প্রতিদিন ২০০ টন বর্জ্য
বরিশাল সিটি কর্পোরেশন এলাকায় বর্তমানে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের বসবাস। ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৭৬ হাজার ২৯৮ জন। জনসংখ্যা ও নগরের পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে প্রতিদিনের বর্জ্যের পরিমাণও।
সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ সূত্রে জানা যায়, নগরে প্রতিদিন প্রায় ২০০ মেট্রিক টন ময়লা-আবর্জনা জমে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা এসব বর্জ্য বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করে নিয়ে যান কাউনিয়া হাউজিং এলাকার গার্বেজ গ্রাউন্ডে।
২০০২ সালের ২৫ জুলাই সরকারি ঘোষণার মাধ্যমে বরিশাল পৌরসভা বরিশাল সিটি কর্পোরেশনে রূপান্তরিত হয়। তখন নগরের আয়তন ও জনসংখ্যা বর্তমানের তুলনায় অনেক কম ছিল। সময়ের সঙ্গে নগর সম্প্রসারিত হয়েছে, বেড়েছে জনসংখ্যা, আর সেই সঙ্গে বেড়েছে বর্জ্যের চাপও। কিন্তু সে অনুপাতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো ও জনবল বাড়েনি বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
৭০০ কর্মীর ওপর বিশাল দায়িত্ব
বিসিসির পরিচ্ছন্নতা বিভাগে ৭০০-এর বেশি কর্মী রয়েছেন। তাদের মধ্যে কেউ মাসিক বেতনভুক্ত, কেউ দিনমজুরিভিত্তিক। শতাধিক নারীও এ কাজে যুক্ত।
এই কর্মীদের কেউ রাস্তা ঝাড়ু দেন, কেউ ড্রেন পরিষ্কার করেন, কেউ বর্জ্য সংগ্রহ ও পরিবহন করেন। নগরের বিভিন্ন খাল ও জলাশয় পরিষ্কার করতেও তাদের দায়িত্ব পালন করতে হয়। মশক নিধন কার্যক্রমেও যুক্ত থাকেন বিভাগের কর্মীরা।
অথচ এই পেশার মানুষগুলোকে অনেক সময় সামাজিক অবহেলা ও কটু কথার মুখোমুখি হতে হয়। তারপরও কাজটিকে ছোট করে দেখেন না তারা।
বিসিসির ৯ নম্বর ওয়ার্ডের পরিচ্ছন্নতাকর্মী মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, “আমরা শহর পরিষ্কার রাখি বলেই সাধারণ মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করতে পারেন। ময়লা-আবর্জনা নিয়মিত সরানোর ফলে রোগজীবাণুর বিস্তার কমে এবং শহরের সৌন্দর্যও বাড়ে। অনেকে আমাদের কাজকে ঘৃণার চোখে দেখেন। কিন্তু শহর পরিষ্কার রাখার মতো মহান কাজ কয়জন করতে পারেন?”
২ নম্বর ওয়ার্ডের নারী সড়ক পরিচ্ছন্নতাকর্মী লক্ষ্মী রানী দাশ বলেন, “কাজ কখনো ছোট নয়। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রতিদিন রাস্তাঘাট পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করি। আমাদের দিকে কর্তৃপক্ষ একটু বিশেষ নজর দিলে ছেলে-মেয়ে নিয়ে ভালোভাবে থাকতে পারব। অনেক রাস্তা ভাঙা ও গর্তযুক্ত হওয়ায় সেখানে পানি জমে থাকে। ফলে ঝাড়ু দিতে কষ্ট হয়। এর সঙ্গে মানুষ যত্রতত্র ময়লা ফেলায় আমাদের কাজ আরও কঠিন হয়ে পড়ে।”
৭ নম্বর ওয়ার্ডের পরিচ্ছন্নতাকর্মী মো. আবুল বাসার বলেন, “আমরা যে কাজ করি, সেটি অন্য অনেকে করতে চান না। কিন্তু আমাদের বেতন-ভাতা খুবই কম। সুযোগ-সুবিধা কিছুটা বাড়ানো গেলে এবং মানসিকভাবে উৎসাহ দেওয়া হলে আমরা আরও আগ্রহ নিয়ে কাজ করতে পারতাম।”
আরও ২০০ কর্মী প্রয়োজন
বিসিসির পরিচ্ছন্নতা বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা মো. ইউসুফ আলী সময়ের বার্তাকে বলেন, নগরের বর্তমান চাহিদার তুলনায় পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংখ্যা কম।
তিনি বলেন, “পরিচ্ছন্নতা বিভাগ নগরের প্রাণ। একদিনও যদি ময়লা পরিষ্কার না করা হয়, তাহলে পুরো শহর দুর্গন্ধে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। অথচ প্রয়োজনের তুলনায় আমাদের জনবল কম। বর্তমানে আরও প্রায় ২০০ পরিচ্ছন্নতাকর্মী প্রয়োজন। জনবল সংকটের কারণে অনেক সময় চাইলেও সব কাজ যথাযথভাবে করা সম্ভব হয় না।”
তার মতে, শুধু জনবল বাড়ালেই হবে না; আধুনিক সরঞ্জামও প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “আমাদের আরও ট্রাক, ভ্যান, ভ্যাকুয়ামসহ আধুনিক যন্ত্রপাতি প্রয়োজন। পর্যাপ্ত লজিস্টিক সাপোর্ট না থাকায় অনেক সময় কাজের গতি ব্যাহত হয়।”
৪৬ খাল থেকে টিকে আছে এক ডজনের কিছু বেশি
বরিশাল একসময় খালনির্ভর নগর হিসেবে পরিচিত ছিল। সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, নগরে একসময় প্রায় ৪৬টি খাল ছিল। দখল ও ভরাটের কারণে অনেক খাল হারিয়ে গেছে। বর্তমানে টিকে থাকা খালগুলোর সংখ্যাও এক ডজনের কিছু বেশি বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
জেল খাল, টিয়াখালী খাল, সাগরদী খাল, বটতলা খাল, জাগুয়া খাল, ভাটার খাল, চাঁদমারী খাল, নবগ্রাম রোড খাল ও লাকুটিয়া খালসহ বিভিন্ন খালে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হচ্ছে।
তবে পরিচ্ছন্নতা বিভাগের কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা হলো, খাল পরিষ্কারের কয়েক দিনের মধ্যেই সেখানে আবার ময়লা ফেলা হয়।
প্রধান কর্মকর্তা মো. ইউসুফ আলী বলেন, “আমরা একটি খাল পরিষ্কার করতে অনেক শ্রম দিই। কিন্তু কিছুদিন পর আবার সেখানে ময়লা ফেলা হয়। নগরবাসী সচেতন না হলে এই সমস্যা থেকে বের হওয়া কঠিন। জেল খাল নিয়েও বর্তমান নগর প্রশাসকের বিশেষ চিন্তাভাবনা রয়েছে।”
পরিষ্কার করলেই শেষ নয়, ফের ময়লা ফেলছে মানুষ
নগরের পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থার বড় একটি সমস্যা হলো বর্জ্য ফেলার ক্ষেত্রে নাগরিকদের অসচেতনতা। নির্দিষ্ট স্থানের পরিবর্তে রাস্তার পাশে, ড্রেনে, খালে কিংবা জলাশয়ে ময়লা ফেলার প্রবণতা রয়েছে।
এতে একদিকে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের কাজ বাড়ছে, অন্যদিকে বৃষ্টির সময় ড্রেন বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও বাড়ছে। প্লাস্টিক ও পলিথিন খালে পড়লে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে জলাশয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন ( বাপা) এর বরিশাল বিভাগীয় সমন্নয়কারী মো. রফিকুল আলম সময়ের বার্তাকে, ” সিটি কর্পোরেশন যতই পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাক, নাগরিকদের আচরণ পরিবর্তন না হলে এ উদ্যোগ স্থায়ী ফল দেবে না।”
বরিশালের যে পাহাড়ে মানুষ যায়না
বরিশাল নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় সংকটের নাম কাউনিয়া হাউজিং এলাকার গার্বেজ গ্রাউন্ড। যেখানে সাধারণ মানুষের পদচারণা নেই। স্থানীয়দের কাছে এটি ” ময়লাখোলা ” হিসেবে সমাধিক পরিচিত।
২০০৩ সালে কাউনিয়া হাউজিং এলাকায় কয়েক একর জমির ওপর এই গার্বেজ গ্রাউন্ড তৈরি করা হয়। তখন এলাকাটি অনেকটাই জনবসতিহীন ছিল। বছরের পর বছর নগরের বর্জ্য সেখানে ফেলা হয়েছে। বর্জ্যের বড় অংশ পুনর্ব্যবহার বা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রক্রিয়াজাত না হওয়ায় সেখানে এখন তৈরি হয়েছে বিশাল ময়লার স্তূপ।
একসময় জনশূন্য থাকা ওই এলাকায় বর্তমানে গড়ে উঠেছে আবাসিক বসতি। ফলে ময়লার ভাগাড়ের পাশেই বসবাস করছেন অসংখ্য মানুষ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্গন্ধ, মশা-মাছির উপদ্রব, বর্জ্য পচনের ধোঁয়া ও দূষণের কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. মজিবুর রহমান সৈকত বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে আমরা কর্তৃপক্ষকে বলে আসছি ময়লার ভাগাড়টি অন্যত্র সরিয়ে নিতে। কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা হয়নি। এই ময়লা খোলার কারণে আমাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। এখানকার পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন।”
ময়লা থেকে তৈরি হচ্ছে ক্ষতিকর গ্যাস
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন বর্জ্য জমে থাকলে সেখানে জৈব বর্জ্য পচনের মাধ্যমে বিভিন্ন গ্যাস তৈরি হয়। এর মধ্যে মিথেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড, হাইড্রোজেন সালফাইড ও অ্যামোনিয়া উল্লেখযোগ্য।
অক্সিজেনের স্বল্পতায় জৈব বর্জ্য পচলে মিথেন তৈরি হয়। এটি অত্যন্ত দাহ্য এবং শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস। অন্যদিকে হাইড্রোজেন সালফাইডের কারণে পচা ডিমের মতো দুর্গন্ধ তৈরি হয় এবং বেশি ঘনত্বে এটি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। অ্যামোনিয়াও শ্বাসতন্ত্র ও চোখে জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে।
বর্জ্য থেকে তৈরি লিচেট মাটিতে বা ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশলে পানি ও মাটির দূষণ ঘটাতে পারে। বর্জ্য পোড়ানোর ফলে ধোঁয়া, সূক্ষ্ম কণা ও অন্যান্য ক্ষতিকর দূষক তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ময়লার ভাগাড় সরিয়ে অন্যত্র নিয়ে যাওয়াই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। প্রয়োজন বর্জ্য পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহার, কম্পোস্টিং ও বৈজ্ঞানিকভাবে বর্জ্য নিষ্পত্তির ব্যবস্থা।
সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ
বরিশাল নগরের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের আরেকটি বড় সমস্যা তাদের কর্মপরিবেশ। অনেক কর্মীকেই যথাযথ মাস্ক, গ্লাভস ও গামবুট ছাড়া ময়লা পরিষ্কার করতে দেখা যায়। ফলে ময়লার সঙ্গে থাকা জীবাণু, ধারালো কাচ বা ধাতব বস্তু, রাসায়নিক পদার্থ এবং চিকিৎসাবর্জ্যের সংস্পর্শে এসে তারা নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন। বরিশাল সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. সুপ্লব চন্দ্র ধর সময়ের বার্তাকে বলেন, “ময়লা-আবর্জনার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের রোগজীবাণু, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক এবং অন্যান্য দূষক থাকতে পারে। পচনশীল বর্জ্য থেকে বিভিন্ন ধরনের গ্যাসও তৈরি হয়। যথাযথ সুরক্ষা ছাড়া দীর্ঘসময় এসব বর্জ্যের সংস্পর্শে থাকলে ত্বক, চোখ ও শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের মাস্ক, গ্লাভস, গামবুটসহ প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।”
মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও নজর প্রয়োজন
পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সমস্যা শুধু শারীরিক নয়, মানসিকও। প্রতিদিন দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশে কাজ করা, সামাজিক অবহেলা, আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘসময় শারীরিক পরিশ্রমের কারণে তাদের ওপর মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য, কর্মদক্ষতা ও মনোবল বাড়াতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সেমিনার কিংবা কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা খুব একটা নেই।পরিচ্ছন্নতা বিভাগের কর্মকর্তারাও মনে করেন, কর্মীদের শুধু শ্রমিক হিসেবে নয়, নগর সেবার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করা দরকার।
বর্জ্যই হতে পারে সম্পদ
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নগর বর্জ্যকে এখন আর শুধু ফেলে দেওয়ার বস্তু হিসেবে দেখা হয় না। বর্জ্য পৃথক করে তার জৈব অংশ থেকে কম্পোস্ট বা জৈবসার তৈরি করা যায়। নির্দিষ্ট প্রযুক্তির মাধ্যমে জৈব বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদন করা সম্ভব। আবার উপযুক্ত প্রযুক্তি ও পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করে কিছু বর্জ্য থেকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। বরিশালেও দীর্ঘদিন ধরে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও গ্যাস উৎপাদনের পরিকল্পনার কথা শোনা গেলেও তা এখনো পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কয়েকটি মৌলিক পরিবর্তন জরুরি। বিশেষ করে বাসাবাড়ি, বাজার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে বর্জ্য আলাদা করে সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য পৃথকীকরণ, জৈব বর্জ্য দিয়ে কম্পোস্ট বা বায়োগ্যাস উৎপাদন এবং অবশিষ্ট বর্জ্য বৈজ্ঞানিকভাবে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
চার ঘণ্টায় কোরবানির বর্জ্য অপসারণের সাফল্য
বরিশাল নগরের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু সাফল্যও রয়েছে। বিশেষ করে কোরবানির ঈদে দ্রুত বর্জ্য অপসারণে সিটি কর্পোরেশনের কার্যক্রম প্রশংসা পেয়েছে।
নগর প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন সময়ের বার্তাকে বলেন, “বর্তমান সরকার আমাকে দায়িত্ব দেওয়ার পর থেকেই নগরকে সার্বক্ষণিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার চেষ্টা করছি। এরই ধারাবাহিকতায় নগরের ড্রেন, খাল, মাঠ ও পুকুর পরিষ্কারে অভিযান চলছে। এবারের কোরবানির ঈদে সারা দেশের মধ্যে অল্প সময়ের ব্যবধানে, প্রায় চার ঘণ্টার মধ্যে নগর থেকে কোরবানির বর্জ্য অপসারণ করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, “পরিচ্ছন্নতা বিভাগের জনবল বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। শ্রম আইন অনুযায়ী মাসিক বেতনভুক্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের মূল বেতন বাড়ানোর ক্ষেত্রে সুযোগ সীমিত। তবে ভাতা ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে আমার জায়গা থেকে যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। কারণ পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাই নগরের স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও পরিবেশ বজায় রাখার অন্যতম প্রধান শক্তি।”
কর্মীদের জন্য আসছে সুরক্ষা সরঞ্জাম
পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন নগর প্রশাসক।
তিনি বলেন, “পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা যাতে নিরাপদে কাজ করতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় মাস্ক, গ্লাভস, গামবুটসহ সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করা হবে। তাদের মনোবল বাড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণ ও সেমিনারসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সরানো হতে পারে কাউনিয়ার গার্বেজ গ্রাউন্ড
কাউনিয়া হাউজিংয়ের ময়লার ভাগাড় নিয়ে দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানে নতুন জায়গায় গার্বেজ গ্রাউন্ড করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন নগর প্রশাসক।
অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন বলেন, “কাউনিয়া হাউজিংয়ের গার্বেজ গ্রাউন্ড অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার জন্য ইতোমধ্যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চলছে এবং এ বিষয়ে একটি চুক্তিও হয়েছে। বর্জ্যকে রিসাইক্লিং ও প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে গ্যাস,সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। আমরা সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে চাই।”
দখলমুক্ত খাল, মাঠ ও পুকুর উদ্ধারের তাগিদ
নগরের খাল, মাঠ ও পুকুর দখল ও ভরাটের বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছেন নগর প্রশাসক।
তিনি বলেন, “নগরের দখলকৃত খাল, মাঠ ও পুকুর উদ্ধারে আমরা সবসময় বদ্ধপরিকর। তবে এ কাজে সরকারের অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকেও সহযোগিতা করতে হবে। নগরবাসীর সহযোগিতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” তার আহ্বান, “বরিশালবাসী যত্রতত্র ময়লা ফেলবেন না। ড্রেন, নদী ও খালে কোনো ধরনের বর্জ্য ফেলবেন না। আমরা পরিষ্কার করলাম, আর আপনারা আবার ময়লা করলেন—তাহলে কোনো উদ্যোগই স্থায়ী হবে না। সবার সহযোগিতায় একটি সবুজ ও পরিচ্ছন্ন বরিশাল গড়ে তোলা সম্ভব।
































