যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে একটি স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর সঠিক সময় এখনই বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এর দ্রুত সমাপ্তি চেয়েছেন। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুদ্ধ অবসানের একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টার মাঝেই তিনি এই মন্তব্য করলেন।
শনিবার (৮ আগস্ট) দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পেজেশকিয়ান জানান, ইরান বর্তমানে একটি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য এটিই উপযুক্ত সময়। তিনি বলেন, দেশের ভেতরে এখন একতা ও শক্তি বিরাজ করছে এবং এই যুদ্ধে ইরানকে বিজয়ী ও শক্তিশালী হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের বিষয়গুলো মোকাবেলায় শুরুতেই ইরান ও ওয়াশিংটনের একটি চ্যানেল তৈরি করা উচিত ছিল বলে তিনি মনে করেন। ওমানের মধ্যস্থতায় চলমান আলোচনার মাধ্যমে একটি সমাধান খুঁজে বের করার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, খুব শিগগিরই হয়তো ইরান এই ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে।
প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো যখন ওমানের সাথে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর জোর চেষ্টা চালাচ্ছে ইরান। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের ওপর যুদ্ধ শুরু করার পর থেকেই তেহরান কার্যত এই গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রণালিটি অবরুদ্ধ করে রেখেছে। এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, প্রণালিটির ট্রানজিট ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত সপ্তাহে ইরান ও ওমান একটি সাময়িক রুট তৈরির বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, যেখানে উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজগুলো তদারকি করবে ইরান এবং বেরিয়ে যাওয়া জাহাজগুলো নিয়ন্ত্রণ করবে ওমান।
তবে আরাগচি স্পষ্ট করেছেন যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি অন্যান্য শর্ত পূরণ এবং গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি কোনো আলোচনা হচ্ছে না, বরং কেবল মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান করা হচ্ছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং যুদ্ধের চূড়ান্ত অবসানের ক্ষেত্রে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল নতুন বেশ কয়েকটি শর্ত জুড়ে দিয়েছে, যা চলমান আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
কাউন্সিলের সচিব মোহাম্মদ বাঘের জোলগাদর জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন তাদের আচরণ সংশোধন না করা পর্যন্ত প্রণালিটি বন্ধ থাকবে। তাদের দেওয়া ছয়টি শর্তের মধ্যে রয়েছে— ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি ও অবমাননা বন্ধ করা এবং ইরান ও লেবানন, ফিলিস্তিন, ইয়েমেন ও ইরাকে তাদের মিত্রদের ওপর হামলা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা।
এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, অঞ্চলটি থেকে মার্কিন নৌ ও বিমান বাহিনী সরিয়ে নেওয়া, চাপিয়ে দেওয়া দুটি যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদান, বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের জব্দ করা সম্পদ নিঃশর্তভাবে ফেরত দেওয়ার দাবিও জানানো হয়েছে এই শর্তগুলোতে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে চুক্তি চূড়ান্ত করার পথে বেশ কিছু প্রধান বাধা রয়েছে, যার মধ্যে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইস্যুটি অন্যতম। ইরান ও ওমানের চুক্তির ফলে প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু হওয়ার সুযোগ তৈরি হলেও, এই জলপথের ওপর ইরানের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও প্রস্তাবিত ফি আরোপের তীব্র বিরোধী যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে, জাহাজ চলাচলের নিয়ন্ত্রণকে একটি বড় দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে দেখছে ইরান।
এছাড়া নিষেধাজ্ঞা এবং মার্কিন অবরোধও একটি বড় বাধা। তেহরানের মতে, উল্লেখযোগ্য কোনো অর্থনৈতিক স্বস্তি নিশ্চিত না করে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার অর্থ হলো নিজেদের সবচেয়ে শক্তিশালী দরকষাকষির হাতিয়ার হাতছাড়া করে ফেলা।
এ কারণেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি জোর দিয়ে বলেছেন, প্রণালিটি খুলে দেওয়ার আগে অন্যান্য শর্তের পাশাপাশি যুদ্ধকালীন ক্ষয়ক্ষতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।






























