কানাডার রেজিনা শহরের একটি কেন্দ্রীয় মসজিদে প্রথমবারের মতো মাইকে উচ্চশব্দে সাপ্তাহিক জুমার আজান দেওয়ার পর সেখানে একের পর এক হুমকি ও নেতিবাচক বার্তা পাঠানো হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ওই অঞ্চলের মুসলিমদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুক্রবার (২৬ জুন) জুমার নামাজের সময় মসজিদ ও মুসলিমদের জমায়েতের স্থানগুলোতে বাড়তি পুলিশ মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
রেজিনা সিটি জামিয়া মসজিদ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত শুক্রবার (১৯ জুন) দুপুর ১টার দিকে প্রথমবারের মতো মসজিদের ছাদের স্পিকার ব্যবহার করে পরীক্ষামূলকভাবে জুমার নামাজের আজান প্রচার করা হয়। প্রায় ৩ মিনিট স্থায়ী এই আজানের পর থেকেই ফোন, ইমেইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্তত ১০ থেকে ১৫টি উগ্র ও হুমকিমূলক বার্তা পেয়েছে মসজিদ কর্তৃপক্ষ।
রেজিনা সিটি জামিয়া মসজিদের পরিচালক মোহাম্মদ আনিসুর রহমান জানিয়েছেন, আজান নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি বড় অংশের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে। অনেকেই ভাবছেন, প্রতিদিন ভোরে বা রাতে দিনে ৫ বার এভাবে উচ্চশব্দে আজান দেওয়া হবে।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আমরা এখানে কাউকে বিরক্ত করতে আসিনি। এই আজান দিনে ৫ বার কিংবা ভোর বা মাঝরাতে দেওয়া হবে না। এটি কেবল সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের আগে মাত্র একবার দেওয়া হবে। আমরা সবার সাথে মিলেমিশে থাকতে চাই ও আমাদের দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত।
রেজিনা পুলিশ সার্ভিস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, স্থানীয় শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা মেনেই ওই মসজিদকে মাইক ব্যবহারের সাময়িক অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এই অনুমতি আগামী ১০ জুলাই, ২০২৬ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এরপর শহর কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ যৌথভাবে বিষয়টি পুনর্মূল্যায়ন করবে।
পুলিশ আরও জানায়, রেজিনায় প্রতি বছর বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনকে এ ধরনের ১০০টিরও বেশি পারমিট দেওয়া হয়। শব্দের তীব্রতা, সময় ও স্থায়িত্ব বিবেচনা করেই এই অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে আজানকে কেন্দ্র করে যেভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে, তা গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে। সম্প্রতি কার্যকর হওয়া কানাডার কঠোর ‘ঘৃণামূলক অপরাধ’ আইনের অধীনে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইউনিভার্সিটি অব রেজিনার জাস্টিস স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক আমিন আসফারি মসজিদের ওপর এমন হুমকির তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তবে একই সাথে তিনি মনে করেন, বৃহত্তর অমুসলিম জনগোষ্ঠীর সাথে আগে থেকে পর্যাপ্ত যোগাযোগ ও সামাজিক সম্পৃক্ততা তৈরি না করে হঠাৎ এভাবে প্রকাশ্যে আজান প্রচারের সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল না।
তার মতে, যখন সাধারণ মানুষ আপনার সামাজিক অবদান সম্পর্কে জানবে না, তখন হঠাৎ এমন ধর্মীয় প্রচার উগ্র ইসলামোফোবিয়া (ইসলামের প্রতি ভয়) বাড়িয়ে দিতে পারে। এর ফলে স্থানীয় মুসলিম শিশুরা আরও বেশি একাকীত্ব ও সামাজিক অবজ্ঞার শিকার হতে পারে।
তবে অধ্যাপক আসফারির এই মতের সাথে দ্বিমত পোষণ করেছেন মসজিদের পরিচালক আনিসুর রহমান। তিনি বলেন, আলোচনা ছাড়া কোনো সমস্যার সমাধান হতে পারে না। কেউ প্রশ্ন করলে আমরা যদি চুপ থাকি, তবে ভুল বোঝাবুঝি আরও বাড়বে। আমরা সবাইকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি, আসুন ও আজানের প্রকৃত অর্থ জানুন।
হুমকি ও প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রথম দিনের আজানকে মুসলিম কমিউনিটির জন্য একটি ইতিবাচক মুহূর্ত হিসেবে দেখছেন মসজিদ কর্তৃপক্ষ। পারমিটের মেয়াদ বাড়লে এটি নিয়মিত চালু রাখার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তারা।
































