রাজশাহী মহানগরীতে চুরি ছিনতাই, দস্যুতা, চাঁদাবাজি ও হেনস্তার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে। তবে এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা হলেও পুলিশ জড়িত অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে তেমন সাফল্য পাচ্ছে না।
অতীতে নগরীর সব প্রবেশদ্বারসহ পথে পথে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকায় অপরাধের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যহারে হ্রাস পেয়েছিল। কিন্তু গত দুই বছর আগে স্থাপিত কয়েক হাজার সিসিটিভি ক্যামেরা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হয় নষ্ট হয়েছে অথবা খোয়া গেছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, প্রযুক্তির এই যুগে অপরাধ দমনে সিসিটিভি ক্যামেরা একটি বড় নিয়ামক যন্ত্র। অপরাধীরা কোন পথে নগরীতে প্রবেশ করছে আবার অপরাধ সংঘটন করে কোন পথে বেরিয়ে যাচ্ছে তা শনাক্তে সিসিটিভি ক্যামেরা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। ফলে নতুন করে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ-আরএমপি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে কিছু সিসিটিভি ক্যামেরা নিজেরা সংগ্রহ করছে এবং কিছু ক্যামেরা অনুদান হিসেবে দিচ্ছে রাজশাহী সিটি করপোরেশন। রোববার রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন ১৫৫টি অত্যাধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরা হস্তান্তর করেছে মেট্রোপলিটন পুলিশকে।
নগর ভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব সিসি ক্যামেরা আনুষ্ঠানিকভাবে মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ফয়েজুল কবিরের কাছে হস্তান্তর করেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন। এ সময় দুই প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র উপকমিশনার (ডিসি) গাজীউর রহমান জানান, ইতোমধ্যে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ কর্তৃপক্ষ ২১৫টি সিসি ক্যামেরা সংগ্রহ করে স্থাপনের কাজ করেছে। এ পর্যায়ে সিটি করপোরেশন আরও ১৫৫টি সিসি ক্যামেরা হস্তান্তর করেছে। সবমিলিয়ে ৩৭০টি সিসি ক্যামেরা নগরীর বিভিন্ন প্রবেশদ্বারসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথে সার্বক্ষণিক কাজ করবে। এসব ক্যামেরা সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখবে নগরজুড়ে। একটি কন্ট্রোল সেন্টারের মাধ্যমে পরিচালিত হবে ক্যামেরাগুলো। এর উদ্দেশ্য হলো অপরাধী কেউ যাতে অপরাধ করে নিজেকে লুকাতে না পারে। পুলিশ ক্যামেরা মনিটরিং এর মাধ্যমে অপরাধীকে শনাক্ত করবে এবং প্রয়োজনীয় আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ জুন রাতে নগরীর সাহেববাজার স্বর্ণপট্টিতে কারুশ্রী জুয়েলার্স নামের একটি দোকানে দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনা ঘটে। চোরের দল দোকানের দেয়াল কেটে ২শ ভরি স্বর্ণ, ১ হাজার ২শ ভরি রূপার অলংকার ও নগদ ২৫ লাখ টাকাসহ মোট ৫ কোটি টাকার মালামাল চুরি করে নিয়ে যায়। ঘটনা জানাজানি হলে স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা অনির্দিষ্টকালের জন্য দোকান বন্ধ রাখার ঘোষণা দেন। আরএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাতদিনের মধ্যে অপরাধীদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু গত এক মাসের বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও এই চুরির ঘটনার কোনো সুরাহা হয়নি। উদ্ধার হয়নি চুরির মালামাল। গ্রেফতার হয়নি কোনো অপরাধী।
এছাড়া নগরীজুড়ে বিভিন্ন বাসাবাড়ি ও অফিসের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের গ্যাস পাইপ চুরির হিড়িক চলছে। গত দুই মাসে এ ধরনের ২৫৯টি চুরির ঘটনা ঘটেছে বলে পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরএমপির এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, স্মরণকালের সবচেয়ে বড় স্বর্ণের দোকানে চুরির এ ঘটনাটি তদন্তে নেমে পুলিশ কোনো দিশা করতে পারছে না। কোথাও কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল না যে অপরাধীদের প্রবেশ ও প্রস্থানের কোনো তথ্য পাওয়া যায়। গোয়েন্দা পুলিশও ঘটনার তদন্ত করছে কিন্তু এক মাসেও তারা কোনো অপরাধীকে শনাক্ত করতে পারেনি।
এদিকে রোববার নগর ভবনে সিসি ক্যামেরা হস্তান্তর অনুষ্ঠানে আরএমপির কমিশনার ফয়েজুল কবির বলেন, প্রযুক্তির এই যুগে সিসি ক্যামেরা অপরাধী শনাক্তে অত্যন্ত কার্যকর টুলস হিসেবে কাজ করে। আমরা নগরজুড়ে সিসি ক্যামেরার জাল বিস্তার করছি। এতে অপরাধের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হবে। অপরাধীরা অপরাধ সংঘটন করে কোনো না কোনো পথে বের হয়ে যায়। সিসি ক্যামেরায় তাদের শনাক্ত করা সহজ হবে। অত্যাধুনিক ক্যামেরাগুলো অপরাধ সংঘটন রোধে প্রিভেনটিভ ও ডিটেকটিভ-দুটোরই কাজ করবে।
নগরীতে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের বিষয়ে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, নাগরিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছি আমরা। জনগণের চাহিদার ভিত্তিতে আমরা কাজ করতে চাই। নগরবাসীর নিরাপত্তার জন্য অত্যাধুনিক সিসি ক্যামেরা প্রদান করা হলো আরএমপিকে। নিরাপদ ও শান্তির মহানগরী গড়তে আমরা সম্মিলিতভাবে কাজ করে যাব। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে আরএমপিকে আরও সহযোগিতা প্রদানের অঙ্গীকার করেন তিনি।
আরএমপির সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড় ও জনসমাগমস্থল স্থানগুলোতে আধুনি ক প্রযুক্তিসম্পন্ন সিসি ক্যামেরাগুলো স্থাপন করা হচ্ছে। এসব ক্যামেরা স্থাপনের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি বৃদ্ধি ও অপরাধ প্রতিরোধ, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখবে। ক্যামেরাগুলি সার্বক্ষণিকভাবে মনিটরিং করবে আরএমপির প্রশিক্ষিত দল।




























