ইরানের বিরুদ্ধে ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এই উদ্যোগকে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ হিসেবে অভিহিত করছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন নিষেধাজ্ঞা কর্মসূচির প্রকৃত সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে তেহরানের প্রতিক্রিয়ার ওপর।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন, ওয়াশিংটন ইরানের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক যুদ্ধ চালাবে। ট্রাম্পও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের দাবি মেনে না নিলে ইরানকে ‘চূর্ণ’ করতে সর্বাত্মক অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা হবে।
তবে ঘোষিত নিষেধাজ্ঞায় নতুনত্বের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে তৃতীয় পক্ষের দেশ, কোম্পানি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ। অর্থাৎ শুধু ইরান নয়, তেহরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলোকেও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হচ্ছে।
চীন ও আমিরাতকে ঘিরে চাপ
ইরানের বৈদেশিক বাণিজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার চীন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য অনুযায়ী, ইরানি তেলের ৯০ শতাংশেরও বেশি কিনে থাকে চীন।
অন্যদিকে আমিরাত দীর্ঘদিন ধরে ইরানের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ইরানের মোট আমদানির প্রায় ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ, যার মূল্য প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলার, এসেছে আমিরাত থেকে।
সম্প্রতি আমিরাত ইরান-সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই দুদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ফলে নতুন ঘোষণা মূলত বিদ্যমান বাস্তবতাকেই আনুষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
চীনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। বেইজিং ইতোমধ্যে স্পষ্ট করেছে যে তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে। ফলে ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংঘাতের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য কি শুধু অর্থনীতি?
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন নিষেধাজ্ঞার একটি বড় অংশ মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির কৌশলও হতে পারে। এর উদ্দেশ্য হতে পারে ইরানকে বোঝানো যে অর্থনৈতিক পতন অনিবার্য এবং সমঝোতা ছাড়া বিকল্প নেই।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও এর প্রভাব রয়েছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের মূল্য রেকর্ড উচ্চতার দিকে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বাজারে স্থিতিশীলতার বার্তা দিতে চায় ট্রাম্প প্রশাসন।
ঘোষণার পরপরই শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম কমে যায় এবং বন্ডবাজারও কিছুটা স্থিতিশীল হয়।
ইরানের সামনে তিনটি পথ
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের সামনে তিনটি সম্ভাব্য কৌশল রয়েছে।
প্রথমত, তেহরান নভেম্বরের ৩ তারিখে অনুষ্ঠিতব্য মার্কিন কংগ্রেস নির্বাচনের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে পারে। ইরানি নেতৃত্বের একটি অংশ মনে করে, ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ট্রাম্পের যুদ্ধনীতি চাপে পড়তে পারে।
এ অবস্থায় ইরান বড় ধরনের উত্তেজনা এড়িয়ে হরমুজ প্রণালিকে কার্যত সীমিত রাখবে এবং মাঝেমধ্যে ট্যাংকারে হামলার মাধ্যমে তেলের বাজারে চাপ বজায় রাখার চেষ্টা করবে।
দ্বিতীয়ত, পাকিস্তান ও ওমানের মধ্যস্থতায় নতুন করে সমঝোতার পথ তৈরি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ইরানকে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দিতে হবে, লেবানন যুদ্ধ বন্ধের শর্ত থেকে সরে আসতে হবে এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করতে হবে।
ইতোমধ্যে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি জানিয়েছেন, ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার ও সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের বৈঠকে ‘গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি’ হয়েছে এবং তারা স্থায়ী শান্তির ব্যাপারে আশাবাদী।
তৃতীয়ত, ইরান যদি মনে করে অপেক্ষা করার চেয়ে উত্তেজনা বাড়ানোই বেশি কার্যকর, তাহলে নতুন করে সংঘাত শুরু হতে পারে।
সম্প্রতি ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজায়ি সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক যুদ্ধ আরও জোরদার করলে মধ্যপ্রাচ্যে কার্যরত মার্কিন তেল কোম্পানি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে ইরানের লক্ষ্য সামরিক বিজয় নয়; বরং আঞ্চলিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়ে তেলের দাম, যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির মূল্য এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ানো। এর মাধ্যমে ওয়াশিংটনের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করাই হতে পারে তেহরানের মূল উদ্দেশ্য।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন অর্থনৈতিক অভিযান ইরানের ওপর চাপ বাড়ালেও এর ফলাফল অনেকটাই নির্ভর করবে তেহরান শেষ পর্যন্ত ধৈর্য, সমঝোতা নাকি নতুন সংঘাত—কোন পথ বেছে নেয় তার ওপর।



































