ইরেক্টাইল ডিসফাংশন বা যৌন দুর্বলতার চিকিৎসার ওষুধ হিসেবেই ভায়াগ্রা বিশ্বজুড়ে পরিচিত। তবে গবেষকরা এখন খতিয়ে দেখছেন, এর সক্রিয় উপাদান ‘সিলডেনাফিল’ অন্য এক গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা সম্ভব কিনা—আর তা হলো ক্যানসারের বিস্তার রোধ করা।
নতুন একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সিলডেনাফিল ক্যানসার কোষকে শরীরের মূল টিউমার থেকে অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে বাধা দিতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ক্যানসারের এই ছড়িয়ে পড়াকে বলা হয় ‘মেটাস্ট্যাসিস’।
যেহেতু ক্যানসারে আক্রান্ত অধিকাংশ রোগীর মৃত্যুর জন্য এই মেটাস্ট্যাসিসই দায়ী, তাই এটি প্রতিরোধের নতুন উপায় খুঁজতে গবেষকরা বেশ আশাবাদী।
তবে এই আবিষ্কার যতটাই রোমাঞ্চকর হোক না কেন, বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন যে গবেষণাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। অধিকাংশ পরীক্ষা-নিরীক্ষাই কেবল ল্যাবরেটরিতে মডেলের ওপর করা হয়েছে। মানুষের ওপর ক্যানসার চিকিৎসায় সিলডেনাফিল ব্যবহারের আগে আরও বিস্তৃত গবেষণা এবং ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের (মানুষের ওপর পরীক্ষা) প্রয়োজন রয়েছে।
তবে ওষুধটি ইতোমধ্যেই অন্যান্য রোগের চিকিৎসার জন্য অনুমোদিত থাকায়, ভবিষ্যতে গবেষণার ফলাফল ইতিবাচক হলে এটিকে দ্রুত অন্য কাজে (ক্যানসার চিকিৎসায়) ব্যবহারের অনুমোদন পাওয়া সহজ হতে পারে।
নতুন এই গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?
‘ক্যানসার রিসার্চ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত উক্ত গবেষণায় দেখা যায়, সিলডেনাফিল—যা একটি পিডিই-ফাইভ ইনহিবিটর—ইঁদুর এবং মানুষের ক্যানসারের বেশ কয়েকটি মডেলে ক্যানসার কোষের ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। এটি সরাসরি ক্যানসার কোষ ধ্বংস করার বদলে সেগুলোর শরীরের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত বা ছড়িয়ে পড়ার পথকে কঠিন করে তোলে।
গবেষকরা দেখেছেন, সিলডেনাফিল প্রয়োগের ফলে ক্যানসার কোষের ভেতরের ‘লাইসোজোম’ নামক স্থানে কোলেস্টেরল আটকে যায়। এর ফলে ক্যানসার কোষগুলোর ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় কোলেস্টেরলের ঘাটতি দেখা দেয়, যা তাদের অন্য টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়া ও আক্রমণ চালানো কঠিন করে তোলে।
মেটাস্ট্যাসিস রোধ করা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
ক্যানসার যখন শরীরের একটি নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন চিকিৎসা দিয়ে তা প্রায়ই সফলভাবে নিরাময় করা সম্ভব হয়। মূল সমস্যা বা আসল বিপদ শুরু হয় তখন, যখন ক্যানসার কোষগুলো মূল টিউমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রক্ত বা লসিকাতন্ত্রের মাধ্যমে ফুসফুস, লিভার বা মস্তিষ্কের মতো অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে।
‘মেটাস্ট্যাসিস’ নামে পরিচিত ক্যানসারের এই রূপটির চিকিৎসা করা অত্যন্ত কঠিন এবং ক্যানসারজনিত সিংহভাগ মৃত্যুর জন্য এটিই দায়ী। তাই এমন একটি ওষুধ যা মেটাস্ট্যাসিসের গতি ধীর করতে বা তা প্রতিরোধ করতে পারে, তা ক্যানসার রোগীদের বেঁচে থাকার হার বাড়াবে এবং বিদ্যমান অন্যান্য চিকিৎসাগুলোকে আরও কার্যকর করে তুলবে।
সিলডেনাফিল কীভাবে কাজ করে?
সিলডেনাফিল মূলত ‘পিডিই-ফাইভ’ নামক একটি এনজাইমকে বাধা দেয়। সাধারণত ইরেক্টাইল ডিসফাংশন এবং পালমোনারি আর্টারিয়াল হাইপারটেনশনের মতো সমস্যায় রোগীদের রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক করতে এটি ব্যবহৃত হয়। তবে নতুন গবেষণায় গবেষকরা এর সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি প্রভাব আবিষ্কার করেছেন।
পিডিই-ফাইভ অবরুদ্ধ করার মাধ্যমে সিলডেনাফিল ক্যানসার কোষের কোলেস্টেরল প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটায়। নতুন কোষের ঝিল্লি তৈরি করতে এবং শরীরে চলাচলের জন্য ক্যানসার কোষের প্রচুর কোলেস্টেরল প্রয়োজন হয়। তাই কোলেস্টেরলের প্রাপ্যতা সীমিত করে দিয়ে ওষুধটি ক্যানসার কোষের ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা কমায়। এতে বোঝা যায়, সিলডেনাফিল কেবল রক্তপ্রবাহের ওপর প্রভাব না ফেলে ক্যানসার কোষের অভ্যন্তরীণ বিপাকীয় পরিবর্তনের মাধ্যমে কাজ করতে সক্ষম।
এটি কি ক্যানসারের নতুন চিকিৎসা হয়ে উঠতে পারে?
এমন একটি সম্ভাবনা রয়েছে, তবে এখনই নয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, সিলডেনাফিল সার্জারি, কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন থেরাপি বা ইমিউনোথেরাপি-এর মতো প্রচলিত ক্যানসার চিকিৎসাগুলোর বিকল্প হবে না। বরং, একদিন হয়তো ক্যানসারের বিস্তার ঝুঁকি কমাতে মূল চিকিৎসার পাশাপাশি সহযোগী হিসেবে ওষুধটি ব্যবহার করা হতে পারে।
এর বড় একটি সুবিধা হলো, অনুমোদিত চিকিৎসা হিসেবে বহু বছর ধরেই সিলডেনাফিল নিরাপদে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ফলে মানুষের শরীরে এর নিরাপত্তা সম্পর্কিত দিকগুলো গবেষকদের আগে থেকেই জানা রয়েছে, যা ভবিষ্যতের গবেষণাকে দ্রুত এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।
ইসরাইলের ক্লালিট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র এপিডেমিওলজিস্ট এবং এই গবেষণার সহ-লেখক ডক্টর সামাহ হায়েক ‘হেলথলাইন’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমরা নির্দিষ্ট কোনো এক ধরনের ক্যানসারের চেয়ে বরং একটি বড় গ্রুপের ক্যানসার রোগীদের রোগ নির্ণয়ের পূর্ববর্তী ভায়াগ্রা ব্যবহারের তথ্য এবং তাদের বেঁচে থাকার সার্বিক হারের মধ্যে সংযোগ মূল্যায়ন করেছি। তাই একটি নির্দিষ্ট ক্যানসারের তুলনায় অন্যটিতে এটি বেশি কার্যকর কিনা, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।’
ড. হায়েক আরও যোগ করেন, ‘আমাদের এই গবেষণায় মূলত পুরুষরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, কারণ সিলডেনাফিল প্রধানত পুরুষদেরই প্রেসক্রাইব করা হয়ে থাকে। ফলস্বরূপ, এই ক্লিনিক্যাল ডেটা থেকে নারীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ফলাফল দেখা যাবে কিনা, তা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি।’
গবেষণার সীমাবদ্ধতা কোথায়?
হ্যা, বর্তমান ফলাফলগুলো মূলত ল্যাবরেটরি পরীক্ষা এবং প্রাণীর (ইঁদুর) ওপর ভিত্তি করে করা প্রাক-ক্লিনিক্যাল গবেষণার। ইঁদুরের ওপর পাওয়া ফলাফল সবসময় মানুষের শরীরে একইভাবে কাজ নাও করতে পারে। গবেষকদের এখনো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে হবে:
১. কোন ধরনের ক্যানসারে এটি সবচেয়ে ভালো কাজ করে?
২. ক্যানসার রোগীদের জন্য কতটুকু মাত্রা বা ডোজ কার্যকর হবে?
৩. ক্যানসার রোগীদের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে এই ওষুধের ব্যবহার নিরাপদ কি না?
৪. প্রচলিত অন্যান্য ক্যানসার চিকিৎসার সঙ্গে সিলডেনাফিল একত্রে কতটুকু কার্যকর?
সঠিকভাবে পরিচালিত মানুষের ওপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালই কেবল এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে পারে। ততদিন পর্যন্ত, সিলডেনাফিল বা ভায়াগ্রাকে ক্যানসারের কোনো নিশ্চিত চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। তবে এই গবেষণাটি ক্যানসারের বিস্তার রোধে ভায়াগ্রার সম্ভাবনা নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।



























