ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের আওতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির সময়সীমা শেষ হয়েছে। তবে যুদ্ধবিরতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য—হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়া—বাস্তবায়িত হয়নি।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর সম্ভাবনা আগে থেকেই ক্ষীণ ছিল। তেহরান ও ওয়াশিংটন দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। খবর সামা টিভি অনলাইনের।
গত জুনে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে দুই দেশ ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। সোমবার সেই সময়সীমা শেষ হলেও কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি।
যদিও যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়াকে অনেকটা প্রতীকী হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের নেতারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, কার্যত ওই চুক্তি আর টিকে নেই।
তবে সময়সীমা পার হওয়া ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জের বিষয়টি স্পষ্ট করেছে। বিশেষ করে ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে রাজি করানোর ক্ষেত্রে ওয়াশিংটন এখনো সফল হয়নি।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে অচলাবস্থা
গত ১৭ জুন ট্রাম্প জাঁকজমকপূর্ণভাবে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ওই চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়া।
বিশ্বের বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। কিন্তু ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ইরান প্রণালিটির ওপর কার্যত অবরোধ আরোপ করায় যুদ্ধবিরতির পরও সেটি পুরোপুরি সচল হয়নি।
মার্কিন কর্মকর্তারা আশা করেছিলেন, যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে জলপথটিতে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা ফিরবে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ওপর চাপ কমবে। কিন্তু বাস্তবে ইরান কৌশলগত এই জলপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
অর্থনৈতিক সংঘাতের দিকে দুই দেশ
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাত কার্যত অর্থনৈতিক যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধবিরতির সময়সীমা শেষ হলেও হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া-সহ গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যগুলো অর্জিত হয়নি।
জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কোনো হামলার খবর প্রকাশ্যে আসেনি। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, দুই দেশ দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপের লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা আবারও সরাসরি সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণকে কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চাপ সৃষ্টি এবং নতুন চুক্তিতে বসতে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধবিরতির সময় ইরানের তেল রপ্তানির জন্য দেওয়া নিষেধাজ্ঞা ছাড় প্রত্যাহার করেছে। পাশাপাশি ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে আবারও নৌ অবরোধ কার্যকর করেছে মার্কিন বাহিনী।
পারমাণবিক আলোচনা পিছিয়ে যায়
জুনের যুদ্ধবিরতির উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত সংঘাত কমিয়ে পরবর্তী সময়ে কঠিন বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা। এর আওতায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা আরও দুই মাস পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে পারে—এমন আশঙ্কাকে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন।
এদিকে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়টি যুদ্ধবিরতির অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ইরানি কর্মকর্তারা চুক্তির ভাষা অস্পষ্ট বলে দাবি করে কিছু জাহাজকে তেহরানের অনুমতি ছাড়া প্রণালি দিয়ে চলাচলের অভিযোগ তোলেন।
এরপর ইরানি বাহিনী কয়েকটি জাহাজে হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা হামলা করে। মার্কিন বাহিনী দক্ষিণ ইরানের কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর পর নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলা শুরু হয়।
বড় সামরিক অভিযানের কথা ভেবেছিলেন ট্রাম্প
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে ট্রাম্প অন্তত দুবার ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর কথা বিবেচনা করেছিলেন। তবে সৌদি আরবসহ আঞ্চলিক মিত্রদের অনুরোধের পর তিনি শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।
এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ সামরিক গোলাবারুদের মজুত কমে যাওয়ার বিষয়ে হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টাদের সতর্কতাও ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হলেও ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মূল বিরোধগুলোর কোনো সমাধান হয়নি। হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপ দুই দেশের মধ্যে আবারও সরাসরি সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে।



































