ইরানের সঙ্গে মাসের পর মাস ধরে চলা যুদ্ধে ব্যাপক টান পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারে। মার্কিন কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুত এমন পর্যায়ে নেমে গেছে, যা ওয়াশিংটনের আরেকটি বড় ধরনের যুদ্ধে জড়াতে গেলে শঙ্কায় পড়ে যাবে।
অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ায় পেন্টাগন ইউরোপ ও এশিয়া থেকে অস্ত্র এবং সামরিক সরঞ্জাম মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। একই সঙ্গে মিত্র দেশগুলোর কাছে কিছু অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ বিলম্বিত করা হয়েছে এবং প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোকে উৎপাদন নাটকীয়ভাবে বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া যুদ্ধে হাজার হাজার ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য নির্ভুল নিশানাভেদী অস্ত্র ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে ইউরোপ ও এশিয়ায় মোতায়েন মার্কিন বাহিনীর জন্য রাখা অস্ত্রের মজুত থেকেও সরবরাহ নিতে হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তারা নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। অস্ত্রের ঘাটতির কারণে ইউরোপ ও এশিয়ার কয়েকটি দেশের কাছে কিছু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহও পিছিয়ে দিতে হয়েছে।
পেন্টাগন ইউরোপ ও এশিয়া থেকে জাহাজ, বিমান এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ইউনিট দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যে পাঠিয়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, এর ফলে সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণ, সেনাদের মনোবল এবং ওই অঞ্চলগুলোতে সামগ্রিক মার্কিন সামরিক শক্তির ওপর একের পর এক প্রভাব পড়ছে।
এ পরিস্থিতি ইউরোপ ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন প্রতিরোধক্ষমতা বা ‘ডিটারেন্স’ বজায় রাখার সক্ষমতা নিয়ে মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ব্যবহার হয়েছে দেড় হাজারের বেশি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র
সবচেয়ে গুরুতর উদ্বেগের একটি হলো ‘প্যাট্রিয়ট’ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে। নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ১ হাজার ৫০০টিরও বেশি প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডার সম্পর্কে অবহিত দুই ব্যক্তি জানিয়েছেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এসব ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ১ হাজার ৭০০টিরও কম।
উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও যুদ্ধে ব্যবহৃত ১ হাজার ৫০০টির বেশি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত পুনরায় পূরণ করতে দুই বছরেরও বেশি সময় লাগতে পারে।
প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে এশিয়া ও ইউরোপে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকির মুখে থাকা মার্কিন বাহিনী ও মিত্রদের জন্য এই ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এশিয়া ও ইউরোপে বাড়ছে উদ্বেগ
মার্কিন সামরিক সম্পদ মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়ার কারণে অন্যান্য অঞ্চলে মিত্রদের সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, কিছু মার্কিন কর্মকর্তা আশঙ্কা করছেন, অস্ত্রের ঘাটতি অব্যাহত থাকলে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান আমেরিকার প্রচলিত সামরিক প্রতিরক্ষার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন বাহিনী ১২টি প্যাট্রিয়ট ব্যাটারি পরিচালনা করে। এসব ব্যাটারিতে PAC-2 ও PAC-3—দুই ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। এগুলোর কিছু ইউনিট ওসান ও পিয়ংটেকসহ বিভিন্ন এলাকায় মোতায়েন রয়েছে।
প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থা আরও উচ্চতায় কাজ করা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যেমন THAAD এবং দক্ষিণ কোরিয়ার Cheongung-II-এর সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করে।
ইরানের সঙ্গে সংঘাতের কারণে দক্ষিণ কোরিয়া ও এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চল থেকে শত শত উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টর মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
জাপানের মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটও মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হয়েছে। প্রয়োজন হলে কোরীয় উপদ্বীপে সামরিক পরিস্থিতি তৈরি হলে এই ইউনিটকে আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে।
পেন্টাগন কৌশলগত নজরদারি বা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের কিছু সক্ষমতাও মধ্যপ্রাচ্যের দিকে সরিয়ে নিয়েছে। পাশাপাশি এশিয়া থেকে কিছু আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর ফলে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সংঘাত শুরু হলে ওই অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর কিছুটা বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
গত বছরও যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে কয়েকটি প্যাট্রিয়ট ব্যাটারি মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একটি চুক্তি হয়েছিল। ওই সিদ্ধান্ত দক্ষিণ কোরিয়ায় অভ্যন্তরীণভাবে উদ্বেগ তৈরি করেছিল—কারণ এতে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষায় সম্ভাব্য ঘাটতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল।
শুধু প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র নয়, অন্যান্য অস্ত্রের মজুতও কমে যাচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, Army Tactical Missile System বা ATACMS এবং Precision Strike Missile বা PrSM-এর মতো উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক ব্যবহারের ফলে প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।
চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য কোনো যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও বড় পরিমাণ গোলাবারুদ ব্যবহার করতে হতে পারে। বিশেষ করে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধের ব্যাপ্তি ও তীব্রতা অনেক বেশি হতে পারে, যার জন্য বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য নির্ভুল নিশানাভেদী অস্ত্র প্রয়োজন হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারের দিকে নজর রাশিয়া-চীনের
মার্কিন অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রভাবও রয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা নিউইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, রাশিয়া ও চীনের সামরিক কর্মকর্তারা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে ওয়াশিংটন কত দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র, গোলাবারুদ ও অন্যান্য অস্ত্র ব্যবহার করছে, তা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।
মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, মস্কো ও বেইজিং নিজেদের সামরিক পরিকল্পনা তৈরির সময় এসব তথ্য বিবেচনায় নিতে পারে। বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ইউরোপ ও এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে মার্কিন প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল করে দিতে পারে। এতে রাশিয়া ও চীনের সামনে মার্কিন প্রতিশ্রুতি পরীক্ষা করার সুযোগ বাড়তে পারে।
এ উদ্বেগ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা বাজেট অনুমোদন পাওয়ার পরও অত্যাধুনিক অস্ত্রের মজুত পুনরায় পূরণ করতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের অস্ত্র উৎপাদন ও সরবরাহ নাটকীয়ভাবে দ্রুত করার নির্দেশ দিয়েছে পেন্টাগন।
ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, বুধবার উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী স্টিভ ফেইনবার্গ প্রতিরক্ষা শিল্পের নির্বাহীদের কাছে একটি স্মারক পাঠিয়েছেন। এতে কোম্পানিগুলোকে সর্বোচ্চ ২১ দিনের মধ্যে বিস্তারিত পরিকল্পনা জমা দিতে বলা হয়েছে—কীভাবে তারা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াবে এবং গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রগুলো সামরিক বাহিনীর কাছে উল্লেখযোগ্যভাবে দ্রুত সরবরাহ করবে, তা ওই পরিকল্পনায় জানাতে হবে।
এই নির্দেশনা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার জন্য অপরিহার্য বলে বিবেচিত বিভিন্ন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
কোম্পানিগুলোকে ‘উল্লেখযোগ্যভাবে দ্রুত এবং আরও আগ্রাসী সরবরাহ সময়সূচি’ গ্রহণ এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সক্ষমতার উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে
তবে অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে নেওয়া হয়েছে, যখন ১ দশমিক ১৫ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা ব্যয় বিল কংগ্রেসে আটকে আছে। ফলে দ্রুত অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর ওয়াশিংটনের প্রচেষ্টা জটিল হয়ে উঠতে পারে।
রাশিয়া ও চীন এসব পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। অন্যদিকে ইউরোপ ও এশিয়ার মিত্ররাও নিজেদের অস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে মূল্যায়ন করছে।
ওয়াশিংটনের জন্য এখন তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হলো—বর্তমান সামরিক অবস্থান ও প্রতিরোধক্ষমতা বজায় রাখার পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত পুনর্গঠন করা, যাতে আরেকটি বড় সংকট দেখা দিলে একই ধরনের চাপ আবার মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারের ওপর না পড়ে।


































