স্বাধীন বিচার বিভাগ, তথ্যপ্রাপ্তি ও মানবাধিকার সুরক্ষার কৌশল>>এম. লোকমান হোসাইন>>একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচার বিভাগ এবং নাগরিকের তথ্য জানার অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে দেশের বিচার বিভাগ যত স্বচ্ছ, সে দেশ তত দ্রুত উন্নতির পথে অগ্রসর হয়। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, নিরাপত্তা এবং নাগরিকের তথ্য জানার অধিকার নিশ্চিত করা। আধুনিকতার ছোঁয়ায় বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে এসব ক্ষেত্রকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
আজকের প্রতিবেদনের মূল আলোচ্য বিষয় হলো—বাংলাদেশে বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা, তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার, বিচারপ্রার্থীর নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের সুরক্ষা কীভাবে নিশ্চিত করা যায়।বিচার বিভাগ হলো সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা, যার কাজ আইন প্রয়োগ ও বিভিন্ন বিবাদের নিষ্পত্তি করা।
এটি আইন ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে। সাধারণত একজন মানুষ তখনই আদালতের দ্বারস্থ হন, যখন তিনি প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কারণে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। কিন্তু বিচার বিভাগে স্বচ্ছতার অভাব থাকলে এবং ন্যায়বিচার না পেলে ধীরে ধীরে জনগণ শুধু বিচার বিভাগ নয়, রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের প্রতিও আস্থা হারায়।
এর ফলে যেমন দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়, তেমনি অপরাধের মাত্রাও বেড়ে যায়।তাই বিচার বিভাগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি। এজন্য সরকারের উচিত কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন আনা এবং নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করা। প্রথমত, বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে। বিচারকার্য সরাসরি সম্প্রচার বা ভিডিও আকারে সংরক্ষণ করতে হবে। মামলার প্রতিদিনের অগ্রগতি উভয় পক্ষকে তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে হবে এবং বিচার বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। এতে বাদী-বিবাদী উভয়েই মামলার অবস্থান সম্পর্কে জানতে পারবে, বিচারকরাও আরও দায়িত্বশীল হবেন।
যদি কোনো বিচারক ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে ন্যায়বিচার থেকে কাউকে বঞ্চিত করেন, তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। এতে বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা আরও বৃদ্ধি পাবে।বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. জাহিদুর রহমান রাজীব বলেন, বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হলে দেশের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সহজ হবে। এজন্য প্রয়োজন অবাধ, নিরপেক্ষ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন বিচার বিভাগ।
সমাজকর্মী তানজিলা হোসাইন বলেন, বিচার বিভাগ শুধু কাগজে-কলমে স্বাধীন না রেখে বাস্তবে স্বাধীন করতে হবে। এতে সাধারণ মানুষের মনে বিচার বিভাগের প্রতি যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে, তা দূর করা সম্ভব হবে।তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিয়েও দেশে নানা প্রশ্ন রয়েছে। দেশের নাগরিক হয়েও অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আবার আইন থাকলেও এর সঠিক প্রয়োগ হচ্ছে না—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার হলো সঠিক তথ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা। কিন্তু তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯–এ কিছু সংস্কার বা সংশোধন প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নাগরিক সমাজের দাবি সত্ত্বেও সরকারের পক্ষ থেকে তথ্য অধিকার আইনে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা হয়নি। এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বর্তমান সরকার তথ্য কমিশন গঠন করেনি।সম্প্রতি ‘আন্তর্জাতিক তথ্য জানার অধিকার দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি বলেন, তথ্য অধিকার আইন শুধু কাগজে-কলমে রাখলে হবে না; এর বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে—তথ্য অধিকার আইন সত্যিই প্রয়োগ হচ্ছে কিনা, নাকি কেবল দেখানোর জন্য রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের উচিত এ বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখা।
বিচার বিভাগসহ যেসব দপ্তর নাগরিকদের তথ্য দিতে বাধ্য, তাদের সচেতনতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। এতে নাগরিকের তথ্য জানার অধিকার বাস্তবে কিছুটা হলেও কার্যকর হবে।সংবাদকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘জাগোরিক’-এর সাধারণ সম্পাদক মো. ফরহাদ হোসেন ফুয়াদ বলেন, দেশের জনগণের সঠিক তথ্য জানার অধিকার রয়েছে, কিন্তু বাস্তবে তা ভিন্ন। কেবল আইন প্রণয়ন করলেই হবে না—আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করলেই প্রকৃত স্বচ্ছতা আসবে।বিচারপ্রার্থীর নিরাপত্তা ও মানবাধিকার সুরক্ষাও আজ সময়ের দাবি। কোনো বিচারপ্রার্থী আদালতের দ্বারস্থ হলে প্রথমেই আসে তার নিরাপত্তার প্রশ্ন। দেশে এমন বহু ঘটনা আছে, যেখানে ন্যায়বিচার চাইতে গিয়ে মানুষ নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছেন।
সম্প্রতি বরিশাল মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা লিটু সিকদার হত্যার মামলার বাদী, নিহতের বোন মুন্নি বেগম অভিযোগ করে বলেন, ভাইকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হলেও পুলিশ রহস্যজনক কারণে আসামিদের গ্রেপ্তার করেনি। তিনি জানান, পুলিশের কাছে একাধিকবার জানানো হলেও তারা ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটনাস্থলে আসেনি। ৯৯৯-এ ফোন করেও কোনো সহায়তা পাওয়া যায়নি।মুন্নির অভিযোগ, মামলার অধিকাংশ আসামি আদালত থেকে জামিন পেয়েছে এবং এখন তারা উল্টো বাদীকেই হত্যার হুমকি দিচ্ছে।
ঘটনার চার মাস পার হলেও তিনি নিজের বাড়িতে ফিরতে পারছেন না, নিরাপত্তাহীনতায় জীবন কাটাচ্ছেন। তার প্রশ্ন—“আমি কোথায় পাবো ন্যায়বিচার?” মুন্নির মতো অসংখ্য ভুক্তভোগী আজ মানবাধিকার তো দূরের কথা, নিজেদের ঘরেও নিরাপত্তা পান না। যতদিন পর্যন্ত আইনের শাসন বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত না হবে, ততদিন সাধারণ মানুষ হয়রানি ও নিপীড়নের শিকার হতে থাকবে।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় জরুরি নির্দেশনা
অতএব, বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা, তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার, বিচারপ্রার্থীর নিরাপত্তা ও মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে, তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং জনগণের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। তবেই বাংলাদেশে প্রকৃত অর্থে ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
উক্ত বিষয় সম্পর্কে কিছু জানার থাকলে কমেন্ট করতে পারেন।
আমাদের সাথে ইউটিউব চ্যানেলে যুক্ত হতে এখানে ক্লিক করুন এবং আমাদের সাথে ফেইজবুক পেইজে যুক্ত হতে এখানে ক্লিক করুন। গুরুত্বপূর্ণ আপডেট ও তথ্য পেতে আমাদের ওয়েবসাইটে ভিজিট করুন।































