নেত্রকোনায় ১৫ বছরের এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে কনটেন্ট ক্রিয়েটর রিপন মিয়ার (৩০) বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বাবা বাদী হয়ে নেত্রকোনা মডেল থানায় মামলাটি করেন।
এর আগে ধর্ষণের ঘটনায় স্থানীয়ভাবে সালিশের আয়োজন করা হয়। সালিশে রিপন মিয়া নিজের দোষ স্বীকার করেন। পরে তাকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানার টাকা ৫ দিনের মধ্যে দেওয়ার জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হয়।
এ ঘটনার একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে দেশব্যাপী সমালোচনার সৃষ্টি হয়। অনেকের মতে, ধর্ষণ বা অনৈতিক সম্পর্ক যা করেছে তা ফৌজদারি অপরাধের আওতায় পরে। এটি সালিশে মীমাংসা যোগ্য নয়।
পরে এ ধর্ষণের ঘটনায় মামলা হয়েছে। মামলার এজাহারে রিপন মিয়াকে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। অভিযুক্ত রিপন মিয়া নেত্রকোনা সদর উপজেলার দক্ষিণ বিশিউড়া গ্রামের মঞ্জিল মিয়ার ছেলে। রিপন পৈত্রিক গ্রাম ছেড়ে কয়েক বছর আছে পার্শ্ববর্তী নন্দুরা গ্রামে বাড়ি করে বসবাস করছিলেন।
পেশায় কাঠমিস্ত্রি রিপন মিয়া ২০১৬ সাল থেকে ফেসবুকে ভিডিও তৈরি করছেন। ‘হাই আই এম রিপন ভিডিও’ ও ‘আই লাভ ইউ, এটাই বাস্তব’—এসব সংলাপের ভিডিও দিয়ে তিনি পরিচিতি পান। ২০১৯ সালে ‘রিপন মিয়া’ নামে ফেসবুকে একটি পেজ খোলেন। পেজটিতে বর্তমানে ফলোয়ারের সংখ্যা ১৯ লাখ।
ওই কিশোরীর পরিবারের অভিযোগ, গত শনিবার রাত ৮টার দিকে তাদের বাড়িতে যান রিপন। তখন ওই স্কুলছাত্রী বাড়ির উঠানে রান্না করছিল। তার বাবা স্থানীয় বাজারে চায়ের দোকানে ও মা বাইরে কাজে ছিলেন। এ সুযোগে ওই ছাত্রীকে জোর করে বাড়ির পাশের একটি জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেন রিপন। পরে মেয়েটির চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে রিপন পালিয়ে যান।
পরিবারটির দাবি, ভিডিও বানানোর কথা বলে রিপন আগে থেকেই কিশোরীটিকে উত্ত্যক্ত করতেন। লোকলজ্জার ভয়ে পরিবারটি প্রথমে বিষয়টি প্রকাশ করেনি। পরে ঘটনাটি এলাকায় জানাজানি হলে গতকাল সোমবার রাতে স্থানীয় একটি বাজারে বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে সালিশ বসে।
সালিশে উপস্থিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি বলেন, ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে ওই বৈঠক হয়। সেখানে স্থানীয় বিএনপি–জামায়াতের নেতাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে রিপন অভিযোগ স্বীকার করে ক্ষমা চান। পরে তাকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা এবং এলাকাছাড়া করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সালিশের কয়েকটি ভিডিও গত মঙ্গলবার সকালে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ৩০ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, অভিযোগ স্বীকার করে উপস্থিত সবার কাছে ক্ষমা চাইছেন রিপন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘ভুল করলেও করছি, না করলেও করছি। আমি, আফনেরার লগে থাহন লাগবো…! ভুল তো মানুষ করেই, আমি একটা ভুল কইরাইলছি।’ কথার এক পর্যায়ে তিনি মাফ চাওয়ার জন্য ফজলুর রহমানের পায়ে ধরেন।
ভিডিওগুলো নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই ধর্ষণের মতো ফৌজদারি অপরাধের বিচার গ্রাম্য সালিসে করাকে আইনবহির্ভূত বলে মন্তব্য করেন।
এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক (উত্তরাঞ্চল) প্রীতম সোহাগ ফেসবুকে লিখেছেন, ধর্ষণের মতো অভিযোগের বিচার আইন অনুযায়ী পুলিশ ও আদালতের মাধ্যমে হওয়া উচিত। দলীয় কার্যালয়ে বসে এমন ফৌজদারি অপরাধের বিচার করার চেষ্টা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার শামিল এবং এটি নিন্দনীয়।
এ বিষয়ে জানতে রিপন মিয়ার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও সংযোগ বন্ধ পাওয়া যায়। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ায় তিনি গা ঢাকা দিয়েছেন।
ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমান বলেন, মেয়েটি দরিদ্র পরিবারের। বিষয়টি জানার পর মেয়েটির পরিবার ও গ্রামের লোকজন আমাদের কাছে বিচার নিয়ে আসে। পরিবারের মামলা চালানোর সামর্থ্যও নেই। পরে আমরা এলাকাবাসী মিলে সালিসে বসেছিলাম। তারপর বলেছি আইনি পদক্ষেপ নিতে। সালিসের মাধ্যমে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এখন পুলিশ এসেছে আমাদের সঙ্গে কথা বলছে।
এদিকে রিপন মিয়ার স্ত্রী চম্পা আক্তার বলেন, ঘটনার বিষয়ে আমি বিস্তারিত জানি না। মানুষের মুখে বিষয়টি শুনেছি। আমার স্বামী নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। তার ওপর অন্যায়ভাবে অভিযোগ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন। ওই শিক্ষার্থীর আগে থেকেই তাদের পরিবারের সঙ্গে যাতায়াত ছিল।
ভুক্তভোগীর মা বলেন, ঘটনার সময় তিনি বাড়িতে ছিলেন না। পরে স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে বিষয়টি জানতে পারেন। এরপর মেয়ের কাছ থেকে অভিযোগের কথা জানতে পারেন।
নেত্রকোনা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল খায়ের বলেন, এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। অভিযুক্তকে গ্রেফতারের জন্য অভিযান চলছে।


































