জাপানে গ্রীষ্মের তীব্র গরমে কর্মীদের দ্রুত ঠান্ডা করতে চালু হয়েছে অভিনব এক ব্যবস্থা—‘মানুষের ফ্রিজ’। ফোন বুথের মতো দেখতে এই যন্ত্রের ভেতরে ঢুকলেই চারদিক থেকে ঠান্ডা বাতাস প্রবাহিত হয়। চলতি বছর বাজারে আসা যন্ত্রটি ইতোমধ্যে নির্মাণকাজের সাইট, কারখানা ও গুদামে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
গুদামকর্মী ইসাও তাবুচি প্রতিদিন সাইকেলে করে কর্মস্থলে যান। প্রচণ্ড গরমে একদিন কর্মস্থলে পৌঁছানোর পর মাথা ঘুরতে শুরু করলে তিনি প্রতিষ্ঠানে স্থাপন করা ‘ডো হিয়েমন বক্স’ নামের এই যন্ত্রে ঢুকে পড়েন। ৫১ বছর বয়সি তাবুচির ভাষায়, কয়েক মিনিটের মধ্যেই শরীর অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে আসে।
টোকিওভিত্তিক শিল্প সরঞ্জাম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ট্রুসকো নাকায়ামা জানিয়েছে, এপ্রিল থেকে তারা ৩০০টির বেশি ‘ডো হিয়েমন বক্স’ বিক্রি করেছে। প্রতিটি ইউনিটের দাম ১৫ লাখ ইয়েন। নির্মাণকাজ, কারখানা ও গুদামের পাশাপাশি ভবিষ্যতে গলফ কোর্স ও বেসবল স্টেডিয়ামেও এর ব্যবহার বাড়তে পারে।
তবে পণ্যটি বাজারে আনার আগে প্রতিষ্ঠানটির মধ্যেও সংশয় ছিল। কারণ যন্ত্রটি আকারে বড় এবং দামেও বেশ ব্যয়বহুল। ফলে শুধু এর সুবিধা ব্যাখ্যা করে ক্রেতাদের আগ্রহী করা কঠিন ছিল বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির বিক্রয় প্রতিনিধি চিনা ইয়ামামোতো।
ভয়াবহ গরমে বিপর্যস্ত জাপান
বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে চরম তাপপ্রবাহের মাত্রা ও ঘনত্ব বাড়ছে। ২০২৫ সালে জাপান ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ গ্রীষ্ম দেখেছে। চলতি বছর ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা অতিক্রম করলে দেশটির আবহাওয়া দপ্তর ‘কোকুশোবি’ বা ‘ভয়াবহ গরমের দিন’ শব্দটি ব্যবহার করছে। আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত টোকিওতেই তাপজনিত কারণে প্রায় ১২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি গ্রীষ্মে দেশজুড়ে প্রায় ৬৩ হাজার মানুষকে জরুরি চিকিৎসা নিতে হয়েছে।
তীব্র গরম মোকাবিলায় গত বছর থেকেই জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কর্মীদের সুরক্ষায় বাড়তি ব্যবস্থা নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নির্মাণশ্রমিকদের ফ্যানযুক্ত জ্যাকেট, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিশ্রামকক্ষ ও ছায়াযুক্ত স্থানের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জুলাইয়ে তেইকোকু ডেটাব্যাংকের এক জরিপে দেখা যায়, ৫০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান তীব্র গরমের কারণে কার্যক্রমে বিঘ্নের কথা জানিয়েছে। প্রায় ৮৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠান কর্মীদের গরম থেকে সুরক্ষায় ব্যবস্থা বাড়িয়েছে।
কর্মীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ
‘ডো হিয়েমন বক্স’ সাধারণ বৈদ্যুতিক সংযোগে চলে এবং সহজে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নেওয়া যায়। বিদ্যুৎ খরচও তুলনামূলক কম। অতিরিক্ত ব্যবহারের ঝুঁকি এড়াতে ২০ মিনিট পর এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
গুদামকর্মী তাবুচির প্রতিষ্ঠান কনোয়ের কর্মকর্তা ইউতাকা কোনো বলেন, কর্মীদের ধরে রাখা এবং নতুন কর্মী আকৃষ্ট করতে তাপ মোকাবিলায় বিনিয়োগ এখন জরুরি। প্রচলিত এয়ার কন্ডিশনার ও স্পট কুলার থাকলেও তাদের কর্মস্থলের অনেক অংশ খোলা রাখতে হয়, যাতে ট্রাক ও ভারী যন্ত্রপাতি চলাচল করতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির ২৪ বছর বয়সি কর্মী তাইচি কোনিশি দিনে প্রায় তিনবার ‘মানুষের ফ্রিজ’ ব্যবহার করেন। ভারী ধাতব সরঞ্জাম ও যন্ত্রাংশ বহনের পর তিনি এতে ঢুকে কয়েক মিনিট বিশ্রাম নেন। তার ভাষায়, মাত্র দুই মিনিটের মধ্যেই শরীরের ঘাম শুকিয়ে যায় এবং প্রচণ্ড গরমের পর শরীরে স্বস্তি ফিরে আসে।



































