রাজধানীর জুলাই জাদুঘরে প্রবেশ করতে না পেরে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন দর্শনার্থীরা। উদ্বোধনের দিন সাধারণ মানুষের জন্য জাদুঘর উন্মুক্ত থাকবে বলে প্রত্যাশা থাকলেও গেট বন্ধ থাকায় দীর্ঘ সময় বাইরে অপেক্ষা করেন তারা।
বুধবার (৫ আগস্ট) জাদুঘরের সামনে জড়ো হয়ে দর্শনার্থীরা এর প্রতিবাদ জানান।
তারা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি কোনোভাবেই বাণিজ্যিকীকরণ বা সীমিত পরিসরে আটকে রাখা উচিত নয়। এসময় উপস্থিত ছিলেন শহীদ পরিবারের সদস্য, জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা এবং বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা সাধারণ দর্শনার্থী।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, সরকার জুলাই জাদুঘর উদ্বোধনের পর এটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে বলে ঘোষণা দিলেও বাস্তবে তাদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই বলেন, তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে এসেছেন, কিন্তু গেট বন্ধ থাকায় ভেতরে যেতে পারেননি।
এক শহীদ মায়ের কণ্ঠেও ছিল তীব্র ক্ষোভ। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, জুলাই সবার। তাহলে আজ টিকিট কেন? আমাদের কেন ভেতরে যেতে দেওয়া হচ্ছে না? জুলাই নিয়ে কোনো ব্যবসা চলতে পারে না। যদি টাকার প্রয়োজন হয়, আমাদের বলুক। আমরা শহীদ পরিবারের সদস্যরা টাকা দেব, তারপরও আজ জাদুঘর খুলে দিতে হবে। আমি আমার ছেলের ছবি দেখতে চাই। মানুষ দেখুক, একটি ছেলে কীভাবে জীবন দিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা রক্ত দিয়ে এই দিন এনেছি। তখন জীবন দিয়েছি, আর আজ আমাদেরই ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। যারা আন্দোলন করেনি তারা যদি ভিআইপি হয়ে ভেতরে যেতে পারে, তাহলে আমরা কেন বাইরে দাঁড়িয়ে থাকব? এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে তো আন্দোলন হয়েছিল।’
আরেক দর্শনার্থী মামুন উর রশিদ বলেন, ‘জুলাই নিয়ে কোনো ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না। এই জাদুঘর শুধু একটি ভবন নয়, এটি একটি ইতিহাস। সেই ইতিহাস সবার দেখার অধিকার আছে। ৫ আগস্টের মতো একটি দিনে এটি বন্ধ রাখার কোনো যুক্তি নেই।’
জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরিকুল ইসলাম জানান, ‘আমি ১৭ জুলাই গ্রেফতার হয়েছিলাম। জেল খেটে ৭ আগস্ট রাতে বের হয়েছি। তাহলে কি আমাদের কোনো অবদান নেই? এখন বলা হচ্ছে শুধু শহীদ পরিবারের সদস্যরা ঢুকতে পারবে, সাধারণ মানুষ পারবে না। এই বৈষম্য কেন? আমরা তো বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি।
তিনি আরও বলেন, ‘আজ সরকারি ছুটি। প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন এটি সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। তাহলে এখনো গেট বন্ধ কেন? অনেকে দুই থেকে চার হাজার টাকা খরচ করে পরিবার নিয়ে এখানে এসেছে। তাদের সবাইকে হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে।’
দর্শনাথীদের অভিযোগ, গেটে তালা লাগিয়ে পুলিশ ও দায়িত্বপ্রাপ্তরা সাধারণ মানুষকে বাইরে আটকে রেখেছেন। তারা বারবার গেট খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়ে স্লোগান দেন। কেউ কেউ বলেন, ‘তালা মারবেন না। এটা জনগণের জায়গা। আজই খুলে দিতে হবে।’
আরাফ মুহসিন এক দর্শনার্থী বলেন, ‘জাতির সামনে এই ইতিহাস যত বেশি তুলে ধরা হবে, তত বেশি মানুষ এটি হৃদয়ে ধারণ করবে। যেমন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নতুন প্রজন্ম বারবার দেখে ও শিখেছে, তেমনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাগুলোও সবাইকে দেখার সুযোগ দিতে হবে। গণঅভ্যুত্থানের পরপরই এটি সবার জন্য খুলে দেওয়া উচিত ছিল। যারা আন্দোলনের সময় ছোট ছিল বা সরাসরি অংশ নিতে পারেনি, তারা অন্তত এই জাদুঘরে এসে ইতিহাস জানতে পারবে। কিন্তু আজ সেই সুযোগই দেওয়া হচ্ছে না।’
আন্দোলনের দুই বছর পর দেশের পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘অনেক কিছু বদলেছে, আবার অনেক কিছু বদলায়নি। বৈষম্য এখনো রয়ে গেছে। ক্ষমতার রাজনীতি আগের মতোই চলছে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে এখনো অনেক পথ বাকি।’
আরেক দর্শনার্থী বলেন, ‘আমি অনেক আশা নিয়ে এসেছিলাম। ভেবেছিলাম উদ্বোধনের দিন সুন্দর পরিবেশ থাকবে, সবাই ভেতরে যেতে পারবে। কিন্তু এসে দেখি সবাই গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমিও দাঁড়িয়ে আছি। এতে খুব খারাপ লাগছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশের বড় বড় ব্যক্তিরা এসেছেন, অনুষ্ঠান হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষকে বাইরে রাখা হয়েছে। এতে মনে হচ্ছে, যে পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে মানুষ আন্দোলন করেছিল, সেই পরিবর্তন এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।’



































