একবার ব্যবহার, তারপর বছরের পর বছর বর্জ্য- প্লাস্টিক ও রাসায়নিকের বোঝা কোথায় যাচ্ছে?
শিশুর পরিচর্যায় ডিসপোজেবল ডায়াপার এখন আর বিলাসপণ্য নয়। কর্মজীবী বাবা-মায়ের ব্যস্ততা, সহজ ব্যবহার এবং দ্রুত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কারণে শহরাঞ্চলে এর ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার সুবিধার বিনিময়ে যে ডায়াপারটি ফেলে দেওয়া হচ্ছে, সেটিই পরিবেশের জন্য তৈরি করছে দীর্ঘস্থায়ী বর্জ্যের বোঝা।
গবেষণা বলছে, ডিসপোজেবল ডায়াপার শুধু সাধারণ বর্জ্য নয়। এতে প্লাস্টিক, সেলুলোজ ও সুপারঅ্যাবজর্বেন্ট পলিমারের মতো বিভিন্ন উপাদান থাকে। ব্যবহারের পর এসব উপাদান বিপুল পরিমাণ কঠিন বর্জ্য তৈরি করে এবং পুনর্ব্যবহারও কঠিন হয়ে পড়ে।
একটি শিশুর প্রতিদিন একাধিক ডায়াপার প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ একটি পরিবারের শিশুর বয়স যত বাড়ে, ব্যবহৃত ডায়াপারের সংখ্যাও তত জমতে থাকে।
সমস্যার বড় জায়গাটি হলো- ডায়াপার মূলত একবার ব্যবহারের জন্য তৈরি। ব্যবহারের পর এটি সাধারণত ময়লার সঙ্গে চলে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যবহৃত ডায়াপারের বর্তমান ব্যবস্থাপনায় মূল্যবান উপাদান হারিয়ে যায় এবং বিপুল পরিমাণ সিটি বর্জ্য তৈরি হয়।
বিশেষ করে ডায়াপারে থাকা প্লাস্টিকজাত উপাদান এবং সুপারঅ্যাবজর্বেন্ট পলিমার সহজে প্রচলিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পুনরুদ্ধার করা যায় না। ডায়াপার সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না হলে এর প্রভাব আরও গুরুতর হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যবহৃত ডায়াপার খোলা জায়গা, জলপথ বা অনিয়ন্ত্রিতভাবে পোড়ানো হলে পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে অনিয়ন্ত্রিত ডাম্পিং ও পোড়ানোর সঙ্গে বায়ু ও জলদূষণের বিষয়টি যুক্ত।
অন্যদিকে ল্যান্ডফিলে জমা হওয়া ডায়াপারও দীর্ঘদিন বর্জ্য হিসেবে থেকে যায়। গবেষণাগুলো দেখিয়েছে, ডায়াপারের পরিবেশগত প্রভাব শুধু ফেলে দেওয়ার পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়, কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে উৎপাদন পর্যন্ত পুরো জীবনচক্রেরই পরিবেশগত প্রভাব রয়েছে।
ডায়াপার পরিবেশের ক্ষতি করে- এমন ধারণা শুধু বর্জ্য জমার কারণে নয়। একটি জীবনচক্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডায়াপার তৈরির ক্ষেত্রে উৎপাদন পর্যায়ই পরিবেশগত প্রভাবের অন্যতম বড় উৎস। বিশেষ করে সুপারঅ্যাবজর্বেন্ট পলিমার উৎপাদন মোট কার্বন নিঃসরণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। গবেষণাটিতে এই উপাদানের অবদান প্রায় ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে বলে হিসাব করা হয়েছে। অর্থাৎ শিশুর শরীরে কয়েক ঘণ্টা ব্যবহারের আগে থেকেই একটি ডায়াপারের পরিবেশগত খরচ শুরু হয়ে যায়- কাঁচামাল সংগ্রহ, পলিমার উৎপাদন, শক্তি ব্যবহার, পরিবহন এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে।
ডায়াপারকে সহজে কাগজ বা প্লাস্টিকের মতো আলাদা করে পুনর্ব্যবহার করা যায় না। কারণ একই পণ্যের মধ্যে থাকে সেলুলোজ, প্লাস্টিক, ইলাস্টিক এবং সুপারঅ্যাবজর্বেন্ট পলিমারের মতো ভিন্ন ভিন্ন উপাদান। ব্যবহারের পর এর সঙ্গে আবার মিশে যায় মূত্র ও মল। ফলে ব্যবহৃত ডায়াপার সংগ্রহ, জীবাণুমুক্তকরণ, বিভিন্ন উপাদান আলাদা করা এবং পুনর্ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন হয় বিশেষ প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর।
গবেষণায় অবশ্য ব্যবহৃত ডায়াপার থেকে উপাদান পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা দেখা হয়েছে। একটি গবেষণায় সুপারঅ্যাবজর্বেন্ট পলিমার পুনরুদ্ধার ও পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে প্রচলিত ল্যান্ডফিল ও ইনসিনারেশনের তুলনায় জীবনচক্রের কার্বন নিঃসরণ কমানোর সম্ভাবনা পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশে নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বড় চ্যালেঞ্জ হলো- বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য একসঙ্গে সংগ্রহ ও ফেলা হয়। শিশুর ব্যবহৃত ডায়াপারও সাধারণত গৃহস্থালি বর্জ্যের অংশ হিসেবেই ব্যবস্থাপনার বাইরে চলে যায়।
এখানেই তৈরি হয় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নঃ- ব্যবহৃত ডায়াপারের জন্য আলাদা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা কোথায়? ডায়াপার থেকে প্লাস্টিক ও সুপারঅ্যাবজর্বেন্ট পলিমার পুনরুদ্ধারের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা আছে কি? খোলা জায়গায় ডায়াপার ফেলা বা পোড়ানো হলে তার পরিবেশগত প্রভাব কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে? দেশে ডায়াপার বর্জ্যের পরিমাণ নিয়ে নিয়মিত কোনো জাতীয় তথ্যভান্ডার আছে কি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না থাকলে ডায়াপারের ব্যবহার যত বাড়বে, ভবিষ্যতে এর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চাপও তত বাড়বে।
বর্তমানে বাজারে পরিবেশবান্ধব, বায়োডিগ্রেডেবল বা প্ল্যান্ট-বেইজড ডায়াপারের মতো বিভিন্ন দাবি দেখা যায়। কিন্তু শুধু প্ল্যান্ট-বেইজড বা ইকো লেখা থাকলেই কোনো পণ্য পুরোপুরি পরিবেশবান্ধব হয়ে যায় না। কারণ একটি পণ্যের পরিবেশগত প্রভাব নির্ভর করে কাঁচামাল, উৎপাদন, পানি ও জ্বালানি ব্যবহার, পরিবহন, ব্যবহার এবং ব্যবহারের পর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ পুরো জীবনচক্রের ওপর। তাই লেবেলের দাবি নয়, স্বাধীন পরিবেশগত মূল্যায়ন ও যাচাইযোগ্য তথ্যই হওয়া উচিত ভোক্তার সিদ্ধান্তের ভিত্তি।
ব্যবহৃত ডায়াপারের পরিবেশগত চাপ কমানোর অন্যতম পথ হতে পারে উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি। গবেষণায় ব্যবহৃত ডায়াপার থেকে উপাদান পুনরুদ্ধারের বিভিন্ন প্রযুক্তি নিয়ে ইতোমধ্যে কাজ হয়েছে। জাপানের একটি গবেষণায় ক্লোজড-লুপ ডায়াপার রিসাইক্লিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ল্যান্ডফিল ও ইনসিনারেশনের তুলনায় গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর সম্ভাবনা পাওয়া গেছে।
তবে কাপড়ের ডায়াপারকে সরাসরি সব পরিস্থিতিতে পরিবেশবান্ধব বিকল্প বলাও ঠিক নয়। কারণ সেগুলোর পরিবেশগত প্রভাব নির্ভর করে পানি ব্যবহার, ডিটারজেন্ট, বিদ্যুৎ, শুকানোর পদ্ধতি এবং কতবার পুনর্ব্যবহার করা হচ্ছে—এসব বিষয়ের ওপর। শিশুর ডায়াপার একটি প্রয়োজনীয় পণ্য হয়ে উঠেছে। তাই ব্যবহার বন্ধের প্রশ্ন নয়, বরং ব্যবহারের পর এর পরিণতি কী হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
একদিকে বাড়ছে ডিসপোজেবল ডায়াপারের ব্যবহার, অন্যদিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এর জন্য বিশেষ অবকাঠামো সীমিত। ফলে প্রতিদিনের ছোট ছোট ব্যবহৃত ডায়াপার মিলেই তৈরি হতে পারে বড় পরিবেশগত বোঝা।
গবেষণার তথ্য বলছে, এই সমস্যার সমাধান শুধু বর্জ্য ফেলার জায়গায় গিয়ে খোঁজা যাবে না। ডায়াপারের কাঁচামাল, উৎপাদন, ব্যবহার এবং শেষ পর্যন্ত পুনর্ব্যবহার বা নিষ্পত্তি পুরো জীবনচক্রকেই বিবেচনায় নিতে হবে।
শিশুর ডায়াপার নিয়ে দেশে এখন প্রয়োজন জাতীয় পর্যায়ের একটি পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত সমীক্ষা। কত ডায়াপার বছরে বাজারে আসে, কতগুলো ব্যবহৃত হয়, কোথায় ফেলা হয়, কত অংশ খোলা জায়গায় বা জলাশয়ের পাশে যায়, কতটা পোড়ানো হয় এবং আদৌ কতটা পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব এসব তথ্য প্রকাশ্যে আসা জরুরি। কারণ আজকের শিশুর কয়েক ঘণ্টার ব্যবহৃত ডায়াপার যেন আগামী দিনের পরিবেশগত সংকটে পরিণত না হয়।
সুবিধার পণ্য হিসেবে ডায়াপারের ব্যবহার বাড়তেই পারে। কিন্তু সেই সুবিধার বর্জ্য যেন নদী, মাটি ও বাতাসের ওপর চাপ হয়ে না ফিরে আসে এ দায়িত্ব শুধু অভিভাবকের নয়। উৎপাদক, আমদানিকারক, স্থানীয় সরকার ও রাষ্ট্রীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সবার।




































