বরিশাল অফিস: কৃত্রিম ত্বকে মোড়ানো ধাতব দেহ, হাতে পরিচ্ছন্ন নখ আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কথোপকথনের সক্ষমতা একাকিত্ব দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নতুন মানবাকৃতির রোবট বাজারে এনেছে চীনের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইউবিটেক।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের তৈরি ‘ইউ১’ বিশ্বের প্রথম পূর্ণাঙ্গ, অতিবাস্তব মানবাকৃতির রোবট, যা গণহারে উৎপাদনের জন্য নকশা করা হয়েছে।
এএফপি জানিয়েছে, রোবটটির চোখে রয়েছে ক্যামেরা, বুকে সেন্সর এবং শব্দ শোনার জন্য মাইক্রোফোন। ব্যবহারকারীদের সঙ্গে কথা বলা, হাত ধরা কিংবা দীর্ঘমেয়াদে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে তোলার মতো বৈশিষ্ট্যও এতে যুক্ত করা হয়েছে।
মঙ্গলবার দক্ষিণ চীনের প্রযুক্তিনগরী শেনঝেনে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ইউবিটেকের ব্র্যান্ড ইউওয়ার্ল্ডের প্রধান মাইকেল ট্যাম বলেন, ‘আমাদের বায়োনিক রোবট সারাজীবন আপনার সঙ্গী হয়ে থাকতে পারবে। এটি কখনও আপনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না, সবসময় বিশ্বস্ত থাকবে এবং নিঃশর্তভাবে আপনাকে ভালোবাসবে।’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে একটি হিউম্যানয়েড রোবটের মুখ স্পর্শ করছেন এক নারী। ছবি: এএফপি
সবচেয়ে সাধারণ সংস্করণের দাম ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৯ হাজার ৮০০ ইউয়ান (প্রায় ১৭ হাজার ৬০০ ডলার)। আর উন্নত সুবিধাসম্পন্ন ‘আলট্রা’ সংস্করণের মূল্য ৯ লাখ ৯০ হাজার ইউয়ান (প্রায় ১ লাখ ৪৫ হাজার ৭০০ ডলার)।
অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করলে রোবটের মুখাবয়ব, চুল ও পোশাক ব্যবহারকারীর প্রিয়জন, কোনো তারকা কিংবা কল্পিত চরিত্রের আদলে তৈরি করা যাবে।
পুরুষ ও নারী উভয় সংস্করণের ইউ১ রোবট কোম্পানির নিজস্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যবহারকারীর ক্লান্তি বা মানসিক চাপ শনাক্ত করে সান্ত্বনামূলক কথা বলতে পারে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার অভ্যাস ও পছন্দ সম্পর্কে শিখে নেয়।
ইউবিটেকের ভাষ্য অনুযায়ী, মূলত একাকী মানুষ ও ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের লক্ষ্য করেই এই রোবট তৈরি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, চীনে এই দুই শ্রেণির মানুষের সংখ্যা যথাক্রমে প্রায় ১২ কোটি ও ৩২ কোটি।
মাইকেল ট্যাম বলেন, ‘এই মানুষগুলোর সঙ্গীর প্রয়োজন অত্যন্ত বেশি।’
কোম্পানির দাবি, ইতোমধ্যে ১৩ হাজার ৩০০টির বেশি প্রি-অর্ডার পাওয়া গেছে এবং আগামী সেপ্টেম্বর থেকে সরবরাহ শুরু হবে। বিশ্বজুড়ে রোবোটিকস শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বিশেষ করে বিদ্যমান উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার সুবিধায় চীনা স্টার্টআপগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।
ইউ১-এর সাধারণ সংস্করণ মাথা, চোখ ও মুখ নড়াতে পারে এবং একবার চার্জে চার ঘণ্টা পর্যন্ত চলতে সক্ষম। তবে এটি ঘরের কাজ বা রান্নাবান্না করতে পারে না।
এ ছাড়া, অন্তরঙ্গ সম্পর্কের জন্যও এটি তৈরি করা হয়নি অন্তত আপাতত, এমনটাই জানিয়েছে ইউবিটেক।
তবে ব্যবহারকারীর দৈনন্দিন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা, ওষুধ খাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেওয়া, সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্ত করতে সহায়তা করা কিংবা একসঙ্গে বিশ্বকাপের খেলা দেখার প্রস্তাব দেওয়ার মতো কাজ করতে পারে রোবটটি।
বিশেষ করে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর একাকিত্ব কমাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার কিছু বৃদ্ধাশ্রমে চ্যাটজিপিটি-চালিত পুতুল ব্যবহার করা হচ্ছে। অন্যদিকে ‘এলিকিউ’ নামের একটি ল্যাম্পসদৃশ এআই ডিভাইস সঙ্গ দেওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের কাজও করছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওমডিয়ার সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রধান বিশ্লেষক লিয়ান জে সু এএফপিকে বলেন, বয়স্কদের সেবা বা মানসিক সুস্থতার মতো বিশেষ খাতে সঙ্গী রোবটের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এসব রোবটকে মানুষের কাছে শারীরিক ও মানসিকভাবে গ্রহণযোগ্য হতে হলে ‘আনক্যানি ভ্যালি’ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। অর্থাৎ, রোবটের মানবসদৃশ আচরণ যেন মানুষের মধ্যে অস্বস্তি সৃষ্টি না করে।
মানুষের আস্থা অর্জনে সক্ষম এআই প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা ও যন্ত্রের প্রতি অতিরিক্ত আবেগজনিত নির্ভরতার বিষয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। অতীতে কিছু চ্যাটবটের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় উৎসাহ দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
ইউবিটেক জানিয়েছে, ইউ১ রোবটের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত সব তথ্য এনক্রিপ্টেড থাকবে এবং সেগুলো কোম্পানির এআই মডেল প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা হবে না। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর আবহও তুলে ধরা হয়। ভিডিও গেম অনুপ্রাণিত পোশাক পরিহিত রোবট ও বিশাল পর্দায় মহাকাশযানের দৃশ্য প্রদর্শন করা হয়। বর্তমানে হোটেল, শপিং মল ও কারখানাসহ চীনের নানা স্থানে বিভিন্ন ধরনের রোবট ব্যবহার হচ্ছে। বার্কলেজ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বিশ্বে স্থাপিত মানবাকৃতির রোবটের ৮৫ শতাংশই ছিল চীনে।
চীনা সরকার রোবোটিকসকে কৌশলগত শিল্প হিসেবে ঘোষণা করেছে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর পর্যন্ত ১৪০টির বেশি চীনা প্রতিষ্ঠান ৩৩০টিরও বেশি মানবাকৃতির রোবট মডেল উন্মোচন করেছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলাফেরা ও বাস্তব জগতের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম এআইচালিত রোবটের বাস্তব প্রয়োগ এখনও সীমিত। বর্তমানে প্রদর্শিত অনেক চমকপ্রদ সক্ষমতাই পূর্বনির্ধারিত প্রোগ্রাম বা দূরনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।




































