চারদিকে নদীবেষ্টিত দেশের একমাত্র দ্বীপ জেলা ভোলা। উন্নত চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা এবং ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার কারণে জেলার অধিকাংশ মানুষ নির্ভরশীল বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ওপর। কিন্তু সেই আস্থার জায়গাতেই দিন দিন বাড়ছে উদ্বেগ। প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও আধুনিক চিকিৎসা সুবিধার অভাব, নিয়মবহির্ভূত অস্ত্রোপচার এবং দুর্বল তদারকির অভিযোগে একের পর এক প্রসূতি মা ও নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা সামনে আসছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ছয় মাসে চিকিৎসা অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার অভিযোগে অন্তত ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রতিটি ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা এলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় অনিয়ম যেন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
জানা যায়, ভোলা জেলা সদর হাসপাতালসহ সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, আইসিইউ, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় সেবার সীমাবদ্ধতার কারণে জটিল রোগী ও প্রসূতিদের বড় একটি অংশ বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ওপর নির্ভরশীল। এই সুযোগে গত কয়েক বছরে জেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান।
অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোতেই নেই নিবন্ধিত অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ, প্রশিক্ষিত নার্স, গাইনি বিশেষজ্ঞ কিংবা জরুরি চিকিৎসা সুবিধা। তারপরও নিয়মিত সিজারিয়ান অপারেশনসহ ঝুঁকিপূর্ণ অস্ত্রোপচার পরিচালনা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার মনিরাম এলাকার ২১ বছর বয়সী গৃহবধূ মোরসেদার মৃত্যু নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পরিবারের অভিযোগ, গত ১৫ জুন নিয়মিত চেকআপের জন্য জেলা শহরের উকিলপাড়ায় অবস্থিত মাতৃনিলয় নার্সিং হোমে গেলে নির্ধারিত সময়ের এক মাস তিন দিন আগেই ভয়ভীতি দেখিয়ে ৭০ হাজার টাকায় সিজার করানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নিহত মোরসেদার স্বামী প্রবাসী আল-আমীন ও ভাই রবিন হোসেন বলেন, গত ১৫ জুন পরিবারের লিখিত সম্মতি ছাড়াই তার অস্ত্রোপচার করা হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে আবারও লিখিত সম্মতি ছাড়া দ্বিতীয় অস্ত্রোপচার করা হয়। সংকটাপন্ন অবস্থায় প্রথমে বরিশাল এবং পরে ঢাকায় নেওয়া হলে ১৬ জুন তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় নিহতের পরিবার দাবি করেছে, গাইনি বিশেষজ্ঞ না হয়েও অস্ত্রোপচার করেছেন মাতৃনিলয় নার্সিং হোমের স্বত্বাধিকারী মাহাবুবা পারভীন। তার বিরুদ্ধে ভোলা সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। অভিযোগের পর তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ভোলা সিভিল সার্জন।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাতৃনিলয় নার্সিং হোমের স্বত্বাধিকারী মাহাবুবা পারভীন।প্রতিবেদনের স্বার্থে ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে চাওয়া হলেও তা সরবরাহ করা হয়নি।
শুধু মোরসেদার ঘটনাই নয়, চলতি বছরের বিভিন্ন সময়ে ভোলার একাধিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগে মৃত্যু হয়েছে প্রসূতি ও নবজাতকের।
গত ১২ জানুয়ারি বন্ধন হেলথ কেয়ারে ভুল রক্ত সঞ্চালনের অভিযোগে এক প্রসূতির মৃত্যু হয়। ২ রা ফেব্রুয়ারি হাবিব মেডিকেল সেন্টারে ভুল ইনজেকশন প্রয়োগের অভিযোগে গর্ভের সন্তানসহ এক প্রসূতির মৃত্যু ঘটে। ১৬ ফেব্রুয়ারি আব্দুল খালেক মেমোরিয়াল হাসপাতালে এক প্রসূতির মৃত্যু হয়। ১৮ ফেব্রুয়ারি ফাতেমা মেমোরিয়াল হাসপাতালে মারা যায় এক নবজাতক। ২২ মে ইসলামিয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভুল চিকিৎসার অভিযোগে আরেক নবজাতকের মৃত্যু হয়।
এ ছাড়া এশিয়া ডায়াগনস্টিক, মোহনা ডায়াগনষ্টিকসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও চিকিৎসা অবহেলায় রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অধিক মুনাফার আশায় অনেক ক্লিনিকে প্রয়োজনীয় জনবল ছাড়াই অস্ত্রোপচার করা হচ্ছে। দক্ষ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরিবর্তে স্বল্প প্রশিক্ষিত বা অদক্ষ জনবল দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা কার্যক্রম। কোনো রোগীর মৃত্যু বা অনিয়মের অভিযোগ উঠলেই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু তদন্ত শেষে কয়টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল হয়েছে, কয়জন চিকিৎসক বা মালিকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে-তার সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। দায়হীনতার এই সংস্কৃতিই অনিয়মকে আরও উৎসাহিত করছে বলে মনে করেন ভোলার সচেতন নাগরিক সমাজ।
এদিকে ভোলা প্রাইভেট ডায়াগনস্টিক ও ক্লিনিক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপচিকিৎসার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংগঠনের পক্ষ থেকেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পাশাপাশি কোন প্রতিষ্ঠান নিয়ম নিতি না মেলে কার্যক্রম পরিচালিত হলে তাদের সমিতির আওতাভুক্ত থেকে বাতিল করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তারা নিয়ম মেনে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছেন বলে দাবি করেন তিনি।
এদিকে ভোলার সিভিল সার্জন ডা. মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগগুলো তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আর জেলা প্রশাসক ডা. শামীম রহমান বলেন, নিয়ম না মেনে পরিচালিত ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ছাড় দেওয়া হবে না।
শুধু তদন্ত কমিটি গঠন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনেষ্টিক সেন্টারে দক্ষ চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করা, নিয়মিত মনিটরিং জোরদার করা, লাইসেন্সবিহীন বা অনিয়মকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি। পাশাপাশি কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে প্রসূতি মা ও নবজাতকের নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত করা কঠিন হবে বলে মনে করেন ভোলাবাসি।































