উন্নয়ন কাজের নামে যেন সরকারি অর্থের অপচয় চলছে বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলায়। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রায় ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা একটি সড়কের কার্পেটিং কাজ শেষ হওয়ার মাত্র তিন দিনের মাথায় উঠে যাচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, ধুলোবালি ও কাদার ওপর নামমাত্র বিটুমিন ব্যবহার করে নিম্নমানের কার্পেটিং করায় হাতের সামান্য স্পর্শেই উঠে আসছে পিচ ও পাথরের আস্তরণ।
ঘটনাটি উপজেলার বাগধা ইউনিয়নের তালবাড়ি এলাকার মাহিলাড়া-আম্বুলা-ছয়গ্রাম-পয়সারহাট সড়কের ৫৪০ মিটার অংশে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এলজিইডির উপ-সহকারী প্রকৌশলীর উপস্থিতিতেই নিম্নমানের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের অক্টোবরে সড়কটির সংস্কারের জন্য ২৪ লাখ ৫৯ হাজার ৮০০ টাকা ব্যয়ে দরপত্র আহ্বান করা হয়। কার্যাদেশ পায় বাবুগঞ্জ উপজেলার মীরগঞ্জ এলাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সরদার ট্রেডিং। তবে মাঠপর্যায়ে কাজটি সাব-কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে স্থানীয় দলিল লেখক মো. জাকির মোল্লা বাস্তবায়ন করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা আলমগীর মোল্লা ও শফিকুল ইসলাম অভিযোগ করেন, রাস্তা সংস্কারে কোনো প্রকৌশলগত নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি। বৃষ্টির পর ভেজা সড়ক পরিষ্কার না করেই ধুলোবালি ও কাদার ওপর বিটুমিন ছিটিয়ে কার্পেটিং করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় পরিমাণ বিটুমিন ব্যবহার না করায় কাজটি শুরু থেকেই নিম্নমানের ছিল। অনিয়মের প্রতিবাদ করলে ঠিকাদারের লোকজন তাদের ভয়ভীতি ও হুমকি দেয় বলেও অভিযোগ করেন তারা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কাজ শেষ হওয়ার তিন দিনের মধ্যেই বিভিন্ন স্থানে পিচ উঠে যেতে শুরু করেছে। কোথাও কোথাও হাত দিয়ে স্পর্শ করলেই পুরো কার্পেটিং উঠে আসছে। এতে পথচারী ও যানবাহন চালকদের জন্য সড়কটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে অনিয়মের দায় কেউ স্বীকার করছে না। মাঠপর্যায়ে কাজ বাস্তবায়নকারী জাকির মোল্লা বলেন, টানা বৃষ্টির পর এক গাড়ি মিশ্রণ (মিক্সড ম্যাটেরিয়াল) আসলে তিনি ভেজা সড়কে কাজ করতে আপত্তি জানান। কিন্তু এলজিইডির উপ-সহকারী প্রকৌশলী দ্রুত কাজ শেষ করার নির্দেশ দেন।
তার ভাষায়, ‘আমি ভেজা রাস্তায় কাজ করতে চাইনি। কিন্তু এসও (উপ-সহকারী প্রকৌশলী) বলেন, কোনো সমস্যা হবে না, সিডিউল অনুযায়ী কাজ শেষ করতে হবে। তার নির্দেশেই কাজ করেছি। এখন সব দায় আমাদের ওপর চাপানো হচ্ছে।’
অন্যদিকে এলজিইডির উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি কাজ শুরু করিয়ে সেখান থেকে চলে এসেছিলাম। পরে ঠিকাদার কী করেছে, তা আমার জানা নেই। যেখানে পিচ উঠে গেছে, সেখানে ঠিকাদারকে দিয়ে পুনরায় কাজ করানো হবে।’
সড়কটি ব্যবহারকারী ভ্যানচালক রবিউল ইসলাম বলেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি দায়িত্বশীল ও সৎভাবে কাজ তদারকি করতেন, তাহলে জনগণের টাকায় করা রাস্তা অন্তত কয়েক বছর টিকত। এখন আমাদের প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।’
এদিকে বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে এলজিইডি কর্তৃপক্ষ। আগৈলঝাড়া উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলী রবীন্দ্র চক্রবর্তী বলেন, অনিয়মের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। বরিশাল এলজিইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরেজমিনে তদন্ত করবেন। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কাজের বিল পরিশোধ বন্ধ রাখা হয়েছে। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান সিডিউল অনুযায়ী পুরো সড়ক পুনর্নির্মাণ না করলে তাদের বিরুদ্ধে লাইসেন্স বাতিলসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের দাবি, নিম্নমানের কাজের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এবং জনগণের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন করা হোক।




























