ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ শুরুর ছয় মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এই সময়ে দেশটির অধিকাংশ মানুষের জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে অবনতি হয়েছে। মুদ্রার মানও ঠেকেছে তলানিতে।
কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, যুদ্ধের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব মানিয়ে নিতে সক্ষম হলেও, নিজেদের আদর্শগত অবস্থান থেকে বড় কোনো ছাড় দেয়নি তারা। কিন্তু প্রায় ৯ কোটি ইরানির জন্য প্রতিদিনের জীবন এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
তেহরানে বসবাসকারী তরুণী মারজান বলেন, আমি এমন একটি জীবন চাই, যেখানে সবসময় অন্যদের সঙ্গে সংঘাতে জড়াতে হবে না, বিশ্বের কাছ থেকে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে হবে না এবং প্রতিদিন কীভাবে বেঁচে থাকব, তা নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে না।
নিরাপত্তার কারণে তিনি শুধু নিজের প্রথম নাম প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, এমন একটি জীবনের কথা তিনি বারবার ভাবেন। কিন্তু সেই জীবন বেছে নেওয়ার সুযোগ না থাকায় হতাশ হন এবং পরের দিনটি পার করার জন্য আবারও একই চক্রে ফিরে যেতে হয়।
রাজনীতি ও কূটনীতি
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হয় যুদ্ধ। ওই হামলায় তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা নিহত হন।
এরপরও ইরান সরকার টিকে থাকে। প্রয়াত নেতার ছেলে মোজতাবা খামেনি দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন। তবে তিনি এখনও জনসম্মুখে খুব একটা আসছেন না। একই সময়ে সামরিক বাহিনীর বেশ কয়েকজন কমান্ডারও পরিবর্তন করা হয়েছে।
ইরানের ক্ষমতাসীন মহলের ভেতরে যুদ্ধ নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। এক পক্ষ কূটনৈতিক সমাধান চায়, অন্য পক্ষ যুক্তরাষ্ট্র পরাজিত হয়ে পিছু না হটা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চায়। তবে উভয় পক্ষই একটি বিষয়ে একমত—যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের কাছে ‘আত্মসমর্পণ’ করা হবে না।
এদিকে হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমানের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর দাবি করেছে ইরান। যুদ্ধের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে জাহাজ চলাচল যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় অনেক কমে গেছে।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এই সমঝোতার বিরোধিতা করছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ওয়াশিংটন চায় হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি ও কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই খুলে দেওয়া হোক।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ আরও বেশ কয়েকটি বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বড় ধরনের মতবিরোধ রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা দুই দেশের মধ্যে আলোচনা পুনরায় শুরু করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের ওপর এ যাবৎকালের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় এখনও কোনো বড় অগ্রগতি দেখা যায়নি।
কমে গেছে বেতন, বেড়েছে মূল্যস্ফীতি
দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও বাইরের চাপের কারণে ইরানের অর্থনীতি বর্তমানে তার সম্ভাবনার তুলনায় অনেক কম সক্ষমতায় চলছে।
ইরানের মর্দাদ মাস, যা ২২ আগস্ট শেষ হয়েছে, সেই মাসে দেশটির পরিসংখ্যান কেন্দ্র জানিয়েছে—এক বছর আগের তুলনায় মূল্যস্ফীতি ৮৯ শতাংশ বেশি ছিল। আর খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ছিল ১২৭ শতাংশেরও বেশি।
তেহরানের একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে ডেটা অ্যানালিস্ট হিসেবে কাজ করা বিজান জানান, প্রায় তিন বছর আগে কোম্পানিতে যোগ দেওয়ার সময় তার মাসিক বেতন ছিল ১ হাজার ডলারের বেশি মূল্যের সমান। কিন্তু মূল্যস্ফীতির কারণে বেতনের প্রকৃত মূল্য অনেক কমে গেছে। তিনি বলেন, তিনবার বেতন বাড়ার পরও এখন আমার বেতনের মূল্য ৫০০ ডলারেরও কম।
৩৩ বছর বয়সী বিজান বলেন, পরিস্থিতি প্রতিদিন খারাপ হওয়ায় তিনি মাঝে মাঝে ভাবেন—এক দশকেরও বেশি সময় আগে স্নাতক ডিগ্রি শেষ করার পর যদি ইরান ছেড়ে চলে যেতেন, তাহলে তার জীবন কেমন হতো।
ইরানের মুদ্রা রিয়ালও রেকর্ড দরপতনের মুখে পড়েছে। শনিবার তেহরানের খোলা বাজারে এক মার্কিন ডলারের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ২০ লাখ ৬০ হাজার রিয়াল—যা রিয়ালের ইতিহাসে সর্বনিম্ন মূল্য।
তেল, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট
যুদ্ধের সময় ইরানের তেল ও গ্যাস স্থাপনা, পেট্রোকেমিক্যাল ও ইস্পাত কারখানা, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য পরিষেবা অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে বাড়িঘর, বন্দর, বিমানবন্দর ও সেতুসহ বিভিন্ন অবকাঠামোও ক্ষতির মুখে পড়েছে।
বিশ্বের অন্যতম সম্পদসমৃদ্ধ দেশ হওয়া সত্ত্বেও ইরান এখন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের অবনতিশীল পরিস্থিতির মুখোমুখি। শীত মৌসুম সামনে রেখে কর্তৃপক্ষ প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতির আশঙ্কা করছে। ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য ইতোমধ্যে জ্বালানি বরাদ্দ কমানো হয়েছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পেট্রলের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনাও করছে সরকার।
সমাজে বাড়ছে নিয়ন্ত্রণ
ইরানি কর্তৃপক্ষ যুদ্ধ নিয়ে বিশ্বের কাছে ‘পবিত্র ঐক্যের’ বার্তা তুলে ধরার ওপর জোর দিচ্ছে। সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে নিজেদের মতামত প্রকাশে সতর্ক থাকলেও রাজনীতিবিদদের বক্তব্যে সরকারের ভেতরের মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
শুক্রবার মোজতাবা খামেনির নামে প্রকাশিত এক লিখিত বার্তায় বলা হয়, সামাজিক সংহতির ক্ষতি করে—এমন যেকোনো কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ।
এর কয়েক ঘণ্টা পর প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, সরকার ভয়াবহ আর্থিক সমস্যার মুখোমুখি। অবরুদ্ধ জনগণের জীবনযাত্রার উন্নতি করা তো দূরের কথা, সরকার তেল বিক্রি করতেও হিমশিম খাচ্ছে।
এদিকে বিচার ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সরকারি বয়ানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিবেচিত যেকোনো কর্মকাণ্ড বা বক্তব্যের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছে।
প্রতি সপ্তাহেই নতুন করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের জুনের ১২ দিনের যুদ্ধ এবং জানুয়ারিতে দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরাও রয়েছেন।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব মৃত্যুদণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে। একই সঙ্গে বাধ্যতামূলক হিজাব আইন আরও কঠোরভাবে প্রয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ২০২২ ও ২০২৩ সালে বাধ্যতামূলক পোশাকবিধির বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভের কয়েক বছর পর আবারও এ আইন প্রয়োগে জোর দেওয়া হচ্ছে।
এই সপ্তাহেই ইসলামি আইন ও প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত নীতিমালা না মানার অভিযোগে আরও কয়েকটি ক্যাফে, আইসক্রিমের দোকান ও ব্যক্তিগত অনলাইন বিক্রেতার কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
তেহরানের আরেক তরুণ বাসিন্দা সাসান বলেন, অভিজ্ঞতা থেকে তিনি দেখেছেন—দেশের ওপর বাইরের চাপ বাড়লেই কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করে।
তার ভাষায়, কখনও কখনও হতাশার কষ্ট অনুভব করি। সবসময় চেষ্টা করেও দেখি, সবকিছু যেন আপনার বিরুদ্ধে কাজ করছে এবং আপনার ভবিষ্যৎ মূলত আপনার নিজের হাতে নেই।



































